ঢাকা ০৮:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঈদের দিন আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ‘২৪ ঘন্টা লক্ষ্যমাত্রার অনেক আগেই কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণে সক্ষম হবোঃ মেয়র তাপস ঈদে নিরাপত্তা হুমকি নেই: সিএমপি কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় সিলেট সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে ঈদুল আযহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাণীশংকৈল উপজেলার মানবিক ইউএনও রকিবুল হাসান পবিত্র ঈদুল আযহার পবিত্র শুভেচ্ছা জানালেন,বাকেরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রাজিব আহম্মেদ তালুকদার। দৈনিক মাতৃভূমির খবর পত্রিকা থেকে সাংবাদিক মোঃ শাহ আলম বহিষ্কার । অগ্রিম ঈদউল আযহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মোঃ রফিকুল ইসলাম রফিক অনুমোদনহীন পশুর হাট বসানোয় ১৬ ব্যবসায়ীকে ঢাদসিক’র পৌনে ১ লাখ টাকা জরিমানা “মেট্রোপলিটন চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি ঢাকা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, পোস্ট বাজেট ২০২৪-২০২৫”

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদ খান, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধিঃ
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—। সবশেষে ‘জয় বাংলা’ বলে ভাষণটি শেষ করেছেন বঙ্গবন্ধু। যে স্লোগানটি পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণের ব্যবচ্ছেদ করলে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকটি সমান্তরালভাবে চোখে পড়ে। শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সে ভাষণটি দেননি। বাঙালি সেদিন তাকে কেন্দ্র করে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। ভাষণে মূলত চারটি দাবি তোলা হয়– মার্শাল ল প্রত্যাহার, সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দাবি পূরণের পরে আমরা ভেবে দেখবো অ্যাসেম্বলিতে বসব কিনা’। এ ধরনের কথা উচ্চারণ করে একদিকে বঙ্গবন্ধু আলোচনার পথ খোলা রাখলেন এবং ভাষণ পরবর্তী সৃষ্ট স্বায়ত্তশাসন দাবির আন্দোলনের দায়ভার থেকে নিজেকে এবং তার দলকে বাঁচিয়ে নিলেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের একমাত্র স্বপ্ন ছিল এদেশের মানুষের জন্য একটি স্বাধীন আবাসভূমি। স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন এক ক্রান্তিকালে। বঙ্গবন্ধু যদি ঐ সময়ে এমন একটি ভাষণ জাতির সামনে পেশ না করতেন তাহলে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন সফল হতো কিনা তা সন্দেহের অবকাশ রাখে। ১ মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি ও তার দলের নেতা-কর্মীরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন ৭ তারিখের ভাষণের ব্যাপারে।
বঙ্গবন্ধু ড. কামাল হোসেনকে ডেকে বলেন, ‘আমি তো লিখিত বক্তব্য দেবো না; আমি আমার মতো করে দেবো। তুমি পয়েন্টগুলো ফরমুলেট কর।’ ড. কামালের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও কয়েকবার বৈঠক করেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়। বঙ্গবন্ধু সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। ৭ই মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্সের ময়দানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন যা লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল। মঞ্চে উঠে চিরাচরিত ভঙ্গিতে সম্বোধনের মাধ্যমে শুরু করেন তার বক্তৃতা।
১৮ মিনিটের ভাষণে তিনি মোট ১১০৮টি শব্দ উচ্চারণ করেন। মিনিটে গড়ে ৪৮ থেকে ৫০টি শব্দ বের হয় তার মুখ দিয়ে। বঙ্গবন্ধু মাটি ও মানুষের নেতা। তাই, তার ভাষণেও মাটি ও মানুষের ভাষা লক্ষ করা যায়। প্রমিত বাংলায় প্রদত্ত সে ভাষণে তিনি তুলে ধরেন শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অলিখিত হলেও ভাষণের মাঝে তালপতন বা পুনরাবৃত্তির কোনো ঘটনা লক্ষ করা যায়নি। শব্দ চয়নের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন যথেষ্ট মার্জিত ও ধৈর্যশীল।
৭ই মার্চের ভাষণের শাব্দিক গুরুত্ববহতার আরেকটি দিক হচ্ছে ভাষণটিতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রবাহানুসারে কথাগুলো বলা হয়েছে। প্রথমদিকে ইতিহাস, মাঝের দিকে অত্যাচার ও অন্যায়ের কথা এবং হুঁশিয়ারির সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার আহ্বান আর শেষের দিকে জনগণের প্রতি দিক-নির্দেশনামূলক কথাবার্তা। ভাষণের শেষের কথাটি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’– ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডায়লগ যেটি শোনার জন্যেই শ্রোতারা মুখিয়ে ছিলেন।
সবশেষে ‘জয় বাংলা’ বলে ভাষণটি শেষ করেছেন বঙ্গবন্ধু। যে স্লোগানটি পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণের ব্যবচ্ছেদ করলে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকটি সমান্তরালভাবে চোখে পড়ে। শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সে ভাষণটি দেননি। বাঙালি সেদিন তাকে কেন্দ্র করে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। ভাষণে মূলত চারটি দাবি তোলা হয়– মার্শাল ল প্রত্যাহার, সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দাবি পূরণের পরে আমরা ভেবে দেখবো অ্যাসেম্বলিতে বসব কিনা’। এ ধরনের কথা উচ্চারণ করে একদিকে বঙ্গবন্ধু আলোচনার পথ খোলা রাখলেন এবং ভাষণ পরবর্তী সৃষ্ট স্বায়ত্তশাসন দাবির আন্দোলনের দায়ভার থেকে নিজেকে এবং তার দলকে বাঁচিয়ে নিলেন।
বঙ্গবন্ধু ভিয়েতনাম, তিব্বতসহ অন্যান্য দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। দেশের প্রধান নেতা হিসেবে সরাসরি বিচ্ছিন্নতার ডাক দিলে সেটি বিরোধীদের কাছে উপযুক্ত কারণ হয়ে দাঁড়াতো আন্দোলন দমন করার এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আইনগতভাবে গ্রেপ্তার করার বা শাস্তি প্রদানের। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে বঙ্গবন্ধু পরিচিত হতেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে এবং বড় বড় দেশ ও বিশ্বসংঘের কাছ থেকে স্বাধীনতার পক্ষে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পাওয়া মুশকিল হয়ে যেত।
৭ই মার্চের ভাষণকে বলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতা-সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানে সীমাহীন ত্যাগ, বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে শুধু নয় বরং ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রের ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ায় এর মাহাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও শাসনতন্ত্র অর্জন করে।
বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ তখনই বিশ্ব দরবারে সমাদৃত হয়। তাকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘Newsweek’ সাময়িকী ১৯৭১-এর এপ্রিল সংখ্যার কভার স্টোরি করা হয়। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণে অনন্য স্থান পাওয়ায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব গবেষণার উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। বাঙালির স্বাধীনতার উষালগ্নে প্রদত্ত এ ভাষণে ৭ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মানসিক প্রস্তুতির সকল দিক-নির্দেশনামূলক এ কালজয়ী ভাষণ প্রদানের দিন ৭ মার্চ।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, অত্যাচার, নিপীড়ন ও বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অনীহা ও কালক্ষেপণ, উপরন্তু বাঙালি হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়নের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। আব্রাহাম লিংকন, চার্চিল, গান্ধী বা মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো মহান নেতাদের ভাষণের প্রেক্ষাপটের মতো বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। একমাত্র গান্ধী ছাড়া সবাই স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন।
মানুষের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও সামরিক অভিযানের উপর্যুক্ত মহান নেতাদের কালজয়ী ভাষণ প্রদত্ত হলেও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালি জাতির চিরলালিত স্বপ্ন স্বাধীনতার পূর্বক্ষণে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ প্রদান করেন তা ছিল ব্যতিক্রম। কারণ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেমন ছিল ৭ কোটি বাঙালির বাঁচার প্রশ্ন তেমনি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সরাসরি রোষানলে না পড়ে প্রয়োজনে সংগ্রামের পরিকল্পনা তুলে ধরা।

Tag :

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঈদের দিন আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আপডেট টাইম ০৯:২৪:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ মার্চ ২০২৩

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদ খান, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধিঃ
ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—। সবশেষে ‘জয় বাংলা’ বলে ভাষণটি শেষ করেছেন বঙ্গবন্ধু। যে স্লোগানটি পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণের ব্যবচ্ছেদ করলে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকটি সমান্তরালভাবে চোখে পড়ে। শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সে ভাষণটি দেননি। বাঙালি সেদিন তাকে কেন্দ্র করে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। ভাষণে মূলত চারটি দাবি তোলা হয়– মার্শাল ল প্রত্যাহার, সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দাবি পূরণের পরে আমরা ভেবে দেখবো অ্যাসেম্বলিতে বসব কিনা’। এ ধরনের কথা উচ্চারণ করে একদিকে বঙ্গবন্ধু আলোচনার পথ খোলা রাখলেন এবং ভাষণ পরবর্তী সৃষ্ট স্বায়ত্তশাসন দাবির আন্দোলনের দায়ভার থেকে নিজেকে এবং তার দলকে বাঁচিয়ে নিলেন।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের একমাত্র স্বপ্ন ছিল এদেশের মানুষের জন্য একটি স্বাধীন আবাসভূমি। স্বাধীনতার মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন এক ক্রান্তিকালে। বঙ্গবন্ধু যদি ঐ সময়ে এমন একটি ভাষণ জাতির সামনে পেশ না করতেন তাহলে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন সফল হতো কিনা তা সন্দেহের অবকাশ রাখে। ১ মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি ও তার দলের নেতা-কর্মীরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন ৭ তারিখের ভাষণের ব্যাপারে।
বঙ্গবন্ধু ড. কামাল হোসেনকে ডেকে বলেন, ‘আমি তো লিখিত বক্তব্য দেবো না; আমি আমার মতো করে দেবো। তুমি পয়েন্টগুলো ফরমুলেট কর।’ ড. কামালের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গেও কয়েকবার বৈঠক করেন। ছাত্রনেতাদের সঙ্গেও বৈঠক হয়। বঙ্গবন্ধু সবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। ৭ই মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্সের ময়দানে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন যা লক্ষ লক্ষ মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছিল। মঞ্চে উঠে চিরাচরিত ভঙ্গিতে সম্বোধনের মাধ্যমে শুরু করেন তার বক্তৃতা।
১৮ মিনিটের ভাষণে তিনি মোট ১১০৮টি শব্দ উচ্চারণ করেন। মিনিটে গড়ে ৪৮ থেকে ৫০টি শব্দ বের হয় তার মুখ দিয়ে। বঙ্গবন্ধু মাটি ও মানুষের নেতা। তাই, তার ভাষণেও মাটি ও মানুষের ভাষা লক্ষ করা যায়। প্রমিত বাংলায় প্রদত্ত সে ভাষণে তিনি তুলে ধরেন শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অলিখিত হলেও ভাষণের মাঝে তালপতন বা পুনরাবৃত্তির কোনো ঘটনা লক্ষ করা যায়নি। শব্দ চয়নের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ছিলেন যথেষ্ট মার্জিত ও ধৈর্যশীল।
৭ই মার্চের ভাষণের শাব্দিক গুরুত্ববহতার আরেকটি দিক হচ্ছে ভাষণটিতে একটি সুনির্দিষ্ট প্রবাহানুসারে কথাগুলো বলা হয়েছে। প্রথমদিকে ইতিহাস, মাঝের দিকে অত্যাচার ও অন্যায়ের কথা এবং হুঁশিয়ারির সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার আহ্বান আর শেষের দিকে জনগণের প্রতি দিক-নির্দেশনামূলক কথাবার্তা। ভাষণের শেষের কথাটি ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’– ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডায়লগ যেটি শোনার জন্যেই শ্রোতারা মুখিয়ে ছিলেন।
সবশেষে ‘জয় বাংলা’ বলে ভাষণটি শেষ করেছেন বঙ্গবন্ধু। যে স্লোগানটি পরবর্তীতে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণের ব্যবচ্ছেদ করলে এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিকটি সমান্তরালভাবে চোখে পড়ে। শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সে ভাষণটি দেননি। বাঙালি সেদিন তাকে কেন্দ্র করে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। ভাষণে মূলত চারটি দাবি তোলা হয়– মার্শাল ল প্রত্যাহার, সেনাদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘দাবি পূরণের পরে আমরা ভেবে দেখবো অ্যাসেম্বলিতে বসব কিনা’। এ ধরনের কথা উচ্চারণ করে একদিকে বঙ্গবন্ধু আলোচনার পথ খোলা রাখলেন এবং ভাষণ পরবর্তী সৃষ্ট স্বায়ত্তশাসন দাবির আন্দোলনের দায়ভার থেকে নিজেকে এবং তার দলকে বাঁচিয়ে নিলেন।
বঙ্গবন্ধু ভিয়েতনাম, তিব্বতসহ অন্যান্য দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। দেশের প্রধান নেতা হিসেবে সরাসরি বিচ্ছিন্নতার ডাক দিলে সেটি বিরোধীদের কাছে উপযুক্ত কারণ হয়ে দাঁড়াতো আন্দোলন দমন করার এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের আইনগতভাবে গ্রেপ্তার করার বা শাস্তি প্রদানের। বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে বঙ্গবন্ধু পরিচিত হতেন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে এবং বড় বড় দেশ ও বিশ্বসংঘের কাছ থেকে স্বাধীনতার পক্ষে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা পাওয়া মুশকিল হয়ে যেত।
৭ই মার্চের ভাষণকে বলা যেতে পারে মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক দিকনির্দেশনা। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও স্বাধীনতা-সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানে সীমাহীন ত্যাগ, বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে অবিসংবাদিত নেতা, জাতির পিতা এবং হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে শুধু নয় বরং ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ ইউনেস্কোর মেমোরি অব ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্রের ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পাওয়ায় এর মাহাত্ম্য বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও শাসনতন্ত্র অর্জন করে।
বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ তখনই বিশ্ব দরবারে সমাদৃত হয়। তাকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ‘Newsweek’ সাময়িকী ১৯৭১-এর এপ্রিল সংখ্যার কভার স্টোরি করা হয়। ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভাষণে অনন্য স্থান পাওয়ায় শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব গবেষণার উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। বাঙালির স্বাধীনতার উষালগ্নে প্রদত্ত এ ভাষণে ৭ কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মানসিক প্রস্তুতির সকল দিক-নির্দেশনামূলক এ কালজয়ী ভাষণ প্রদানের দিন ৭ মার্চ।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণ, অত্যাচার, নিপীড়ন ও বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের অনীহা ও কালক্ষেপণ, উপরন্তু বাঙালি হত্যার নীল নকশা বাস্তবায়নের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। আব্রাহাম লিংকন, চার্চিল, গান্ধী বা মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো মহান নেতাদের ভাষণের প্রেক্ষাপটের মতো বঙ্গবন্ধুর ভাষণের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। একমাত্র গান্ধী ছাড়া সবাই স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন।
মানুষের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ও সামরিক অভিযানের উপর্যুক্ত মহান নেতাদের কালজয়ী ভাষণ প্রদত্ত হলেও ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালি জাতির চিরলালিত স্বপ্ন স্বাধীনতার পূর্বক্ষণে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ প্রদান করেন তা ছিল ব্যতিক্রম। কারণ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ যেমন ছিল ৭ কোটি বাঙালির বাঁচার প্রশ্ন তেমনি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সরাসরি রোষানলে না পড়ে প্রয়োজনে সংগ্রামের পরিকল্পনা তুলে ধরা।