বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন

সোহাগপুর বিধবা পল্লীতে শোকের মাঝেও সুখের ছোঁয়া

শাহরিয়ার মিল্টন : ২৫ জুলাই সোহাগপুর গ্রামের মানুষের জন্য বীভৎস একটি দিন। ১৯৭১ সালের এদিনে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সোহাগপুর বেনুপাড়া গ্রামে কৃষকের ছদ্ববেশে মুক্তিযোদ্ধা লুকিয়ে আছে, অজুহাতে পাক হানাদার বাহিনী চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। পাখির মত নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে গ্রামের ১৮৭ জন নিরীহ পুরুষকে। বিধবা হন গ্রামের ৬২ জন গৃহবধু। আর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীদের বর্বরতার শিকার হন ১৪ জন গৃহবধু । সেদিনের সেই হত্যাযজ্ঞ নিঃসন্দেহে এক বর্বরোচিত ‘গণহত্যা’ যার বেদনাদায়ক স্মৃতি কথা অনেকেরই জানা নেই। স্বাধীনাতার পর পুরুষ শূন্য ওই গ্রামটির নাম হয় ‘বিধবা পল্লী’। বুকে পাথর সমান কষ্ট চেপে স্বামী ও সন্তান হারা ওই বিধবা পল্লীতেই কালের সাক্ষী হয়ে আজো বেচেঁ আছেন ২৪ জন বিধবা। বীরাঙ্গনা ১৪ জন নারীর মধ্যে দুইজন মারা গেছেন। বেঁচে আছেন ১২ জন। দেশ স্বাধীনের ৪৮ বছর পর একাত্তরে পাকিস্তানী বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে নির্যাতিত সোহাগপুর বিধবা পল্লীর ১২ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এরা হলেন সমলা বেওয়া, হাফিজা বেওয়া ,জবেদা বেওয়া, আছিরন বেওয়া, জোবেদা বেওয়া , হাসেন বানু ,মহিরন বেওয়া, আছিরন নেছা, জরিতন বেওয়া, হাসনে আরা, হাজেরা বেগম (১) ও হাজেরা বেগম (২) । স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এসব বীরাঙ্গনারা বর্তমানে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো মাসিক দশ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন। এছাড়া সরকারি চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবাসহ সকল ক্ষেত্রে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পান, তার সবটাই পাবেন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের সদস্যরা। এদিকে সরকার সোহাগপুরের বিধবাদের ভাগ্যোন্নয়নে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। এ বিধবাপল্লীতে ২৯ টি পরিবার থাকার জন্য ১টি করে পাকা ঘর পেয়েছেন। প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যয় হয়েছে ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা করে। সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর উদ্যোগে ট্র্রাস্ট ব্যাংকের সিএসআর কার্যক্রমের আওতায় সোহাগপুরের বিধবারা এখন দুই হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক মাসিক ৪শ’ টাকা হারে বিধবাদের ভাতা দিচ্ছেন। বিধবা ভাতা কিংবা বয়স্ক ভাতার আওতায় আনা হয়েছে এসব বিধবাদের। এছাড়া স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাঁচশ টাকা করে ভাতা দেয়া হচ্ছে। সরকার আর প্রশাসনের নজরে গ্রামটি এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে। শোকের মাঝেও যেন সুখের ছোঁয়া লেগেছে বিধাবা পল্লীতে। এদিকে ২৫ জুলাই সোহাগপুর গণহত্যা দিবসে শেরপুর পুলিশ বিভাগের আয়োজনে বিধবাদের সংর্বধনা দেয়া হয়। এসময় জীবিত ২৪ বিধবাদেকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে তাদের হাতে শাড়ী ও উপহার সামগ্রী তুলে দেন পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম। বীরঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা সমলা বেওয়া (৭৮) বলেন, বাড়ি-ঘর পেয়েছি, মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিও পেয়েছি । এখন আমরা ভালোই আছি। মরে গেলেও এখন কোনো দু:খ থাকবে না। স্বামী স্বজনদের কথা মনে হলে কষ্ট লাগে কিন্ত সরকার এ গণহত্যার বিচার করে সেই কষ্টও দুর করেছে । মুক্তিযোদ্ধা হাফিজা বেওয়া (৬৯) বলেন , প্রধনামন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বর্তমান এমপি সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানাই। আগে আমরা খেয়ে-নাখেয়ে দিন কাটাতাম। মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পেয়ে এখন নাতি-পুতি নিয়ে ভালই চলছি। বীরঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা জোবেদা বেওয়া (৭৫) ও হাসেন বানু (৬৫) বলেন ,সরকার আমাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির পাশাপাশি থাকার ঘর বানিয়ে দিয়েছে। এখন আমরা সুখেই আছি। এবার সোহাগপুর বিধবাপল্লীর উপর প্রামান্য চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী । ১৯ পদাতিক ডিভিশনের ৩০৯ পদাতিক বিগ্রেডের ৫৮ ই বেঙ্গলের উপ অধিনায়ক মেজর মো. সোহেল রানা (পিএসসি) বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি দল ৪ জুলাই সোহাগপুর বিধবাপল্লী পরিদর্শন করেছেন। বিধবাপল্লীর উপর প্রামান্য চিত্র নির্মাণ ও তাদের ব্যক্তি জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কাজ করবে সেনাবাহিনীর ওই দলটি। এছাড়া সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে সোহাগপুরে স্থাপিত হয়েছে বীরকণ্যা প্রাথমিক বিদ্যালয় । সোহাগপুর শহীদ পরিবার কল্যণ ট্র্রাষ্ট্রের সাধারন সম্পাদক জালাল উদ্দিন বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানীদের হাতে সোহাগপুরের নিহত ১৮৭ জনের নাম সংরক্ষণের জন্য বিধবা পল্লীর বর্তমান স্মৃতিফলক ও ছাউনিগুলো ব্যাক্তি মালিকানা জমির উপর নির্মাণ করায় ভবিষ্যতে তা হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের দাবী ওই জমিগুলো সরকারীভাবে কিনে তা বিধবা পল্ল’ীর নামে ওয়াকফো করার। সেসঙ্গে তিনি নতুন প্রজন্মের জন্য ভাস্কর্য নিমার্ণের মাধ্যমে সোহাগপুর বিধবা পল্লীর গণহত্যার ইতিহাস সংরক্ষন করার দাবিও জানান।

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar