মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২০, ০৭:৪২ অপরাহ্ন

শেষ বলের ছক্কায় জেতানোর নায়ক যাঁরা

মাতৃভূমির খবর ডেস্ক :  অবশেষে নিঃসঙ্গতা ঘুচল শিবনারায়ণ চন্দরপলের! ২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে শেষ বলে ৬ রানের সমীকরণ মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জিতিয়েছিলেন চন্দরপল। চামিন্ডা ভাসের ওভারে শেষ ২ বলে ১০ রান নিয়েছিলেন মন্থর ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।

কাল ওমানের আল আমেরাতে হল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে শেষ বলে ৬ রান দরকার ছিল আয়ারল্যান্ডের। আগের বলে রান নিতে ব্যর্থ স্টুয়ার্ট পয়েন্টার মেরে দিলেন ছক্কাই। শেষ বলের এই ছক্কায় মাত্র ১ উইকেটে জেতে আইরিশরা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসে শেষ বলে ৬ রানের সমীকরণ মিলিয়ে দলকে জেতানোর উদাহরণ এই দুটিই।

চন্দরপল ও পয়েন্টার শেষ বলে প্রয়োজন মিটিয়েছেন ৬ রানের। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শেষ বলে ছক্কা মেরে দলকে জিতিয়েছেন আরও পাঁচ ব্যাটসম্যান। যাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত তো ১৯৮৬ সালে অস্ট্রেলেশিয়া কাপে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই ছক্কা। শেষ বলে ৪ রান দরকার ছিল পাকিস্তানের, চেতন শর্মার ফুল টসে ছক্কা মেরে দেন মিয়াঁদাদ।
এরপর এই দলে যোগ হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার ল্যান্স ক্লুজনার ও রায়ান ম্যাকলারেন, জিম্বাবুয়ের ব্রেন্ডন টেলর এবং ভারতের দিনেশ কার্তিকের নাম। ২০০৬ সালে ওয়ানডেতে টেলর ও ২০১৮ সালে টি-টোয়েন্টিতে কার্তিকের দলের শেষ বলে দরকার ছিল ৫ রান। দুবারই প্রতিপক্ষের নাম বাংলাদেশ।

জাভেদ মিয়াঁদাদ (শারজা, ১৯৮৬)
কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাটিং করতেই যেন বেশি ভালোবাসতেন জাভেদ মিয়াঁদাদ। পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান ম্যাচের শেষ বলে ছক্কা মেরে ১৯৮৬ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের বিপক্ষে দেশকে এনে দিয়েছিলেন অবিস্মরণীয় এক জয়। ছিয়াশির এপ্রিলে অস্ট্রেলেশিয়া কাপের ফাইনালের শেষ ওভার ছিল ওটা। ভারতীয় পেসার চেতন শর্মার শেষ বলটিতে পাকিস্তানের জয়ের জন্য দরকার ছিল ৪ রানের। মোটামুটি বল করা শর্মা শেষ বলটি ফুলটস দিয়েই সর্বনাশ করেন। উইকেটে জমে থাকা মিয়াঁদাদ ফুলটসটি লং অনের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। পাকিস্তান জিতল ইতিহাসের প্রথম অস্ট্রেলেশিয়া কাপ। ইতিহাসেও জায়গা করে নিল মিয়াঁদাদের সেই ছক্কা।

ল্যান্স ক্লুজনার (নেপিয়ার, ১৯৯৯)
দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ওয়ানডে সিরিজের একটি ম্যাচ ছিল এটি। প্রোটিয়া অলরাউন্ডার ল্যান্স ক্লুজনার দারুণ ফর্মে। নেপিয়ারে সিরিজের চতুর্থ ওয়ানডেতে নিউজিল্যান্ডের ২৫৭ রান তাড়া করতে নেমে ম্যাচটাকে প্রায় নিজেদের দিকেই টেনে এনেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ম্যাচের শেষ বলে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়োজন ছিল ৪ রানের। বল হাতে তখন কিউইদের ভরসা ডিওন ন্যাশ। হার্ড হিটিং ক্লুজনার ন্যাশের মিডিয়াম পেসকে নেপিয়ারের মোটামুটি ছোট মাঠে বাউন্ডারির বাইরে আছড়ে ফেলে দলকে এনে দেন দারুণ এক জয়।

ব্রেন্ডন টেলর (হারারে, ২০০৬)
হারারের এই ম্যাচটা সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার জন্য দুঃস্বপ্ন হয়েই আছে। জিম্বাবুয়ে ও বাংলাদেশের মধ্যকার ওয়ানডে সিরিজের চতুর্থ ওয়ানডে ছিল এটি। জিম্বাবুয়ে এগিয়ে ২-১ ব্যবধানে। আগে ব্যাট করে বাংলাদেশ ২৩৭ রান তুলে জিম্বাবুয়েকে ভালোই চাপে রেখেছিল। কিন্তু জিম্বাবুইয়ানদের হয়ে সেদিন আস্থার প্রতীক হয়ে ছিলেন ব্রেন্ডন টেলর। ম্যাচের শেষ ওভারে জিম্বাবুয়ের দরকার ছিল ১৭ রান। বল করছিলেন মাশরাফি। সেদিন মাশরাফির বোলিং যেন একটু বেশিই নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। প্রথম পাঁচ বলেই ব্যবধানটা কমে গেল ১২ রান। শেষ বলে দরকার ৫ রান। মাশরাফি শেষ বলটাও দিয়ে দিলেন টেলরের একেবারে নাগালে। ছক্কা! ম্যাচটি জিতে সেবার ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজ নিশ্চিত করেছিল জিম্বাবুয়ে।

শিবনারায়ণ চন্দরপল (পোর্ট অব স্পেন, ২০০৮)
চামিন্ডা ভাসের শেষ বলে ছক্কা মেরে দল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জিতিয়েছিলেন শিবনারায়ণ চন্দরপল! ‘ঠুক-ঠুক’ ইনিংসের জন্যই মূলত যাঁর পরিচিতি। ২০০৮ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ম্যাচটায় চন্দরপল কেন যেন নিজেকে একটু অন্য রূপেই তুলে ধরেছিলেন। জয়ের জন্য ম্যাচের শেষ বলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দরকার ছিল ৬ রান। ভাসের বলটি বাউন্ডারি সীমানার বাইরে ফেলে ক্যারিবীয়দের চন্দরপল এনে দেন স্মরণীয় এক জয়।

এড রেইনসফোর্ড (হারারে, ২০১০)
ব্রেন্ডন টেলরের পর দ্বিতীয় জিম্বাবুইয়ান হচ্ছেন এড রেইনসফোর্ড, যিনি ম্যাচের শেষ বলে ছক্কা মেরে দেশকে জয় এনে দিয়েছেন। তবে টেলরের সঙ্গে রেইনসফোর্ডের ছক্কায় একটু পার্থক্য আছে। আইরিশ বোলার কেভিন ও’ব্রায়ানের শেষ ওভারের শেষ বলটিতে অবশ্য জয়ের জন্য অত বিশাল শটের প্রয়োজন ছিল না। শেষ বল থেকে জিম্বাবুয়ের যখন মাত্র ১ রান দরকার, তখন রেইনসফোর্ড ছক্কাই মেরে দেন। ২০১০ সালে হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

রায়ান ম্যাকলারেন (পচেফস্ট্রুম, ২০১৩)
নেপিয়ারে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ক্লুজনারের সেই বিখ্যাত ‘শেষ বল ছক্কা’র এক যুগ পর আরেক প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান রায়ান ম্যাকক্লারেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই একই কাহিনির পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে শেষ বলে ছয় মেরে দলকে জিতিয়েছিলেন ম্যাকক্লারেন। এই ম্যাচে হতভাগ্য বোলার ছিলেন জেমস ফ্র্যাংকলিন।

ব্রেন্ডন ম্যাককালাম (হাম্বানটোটা, ২০১৩)
হাম্বানটোটার সেই ম্যাচের রঙ্গনা হেরাথের শেষ ওভারের শেষ বল থেকে ১ রান তুলে নিতে পারলেই ম্যাচটা নিজেদের করে নিতে পারত নিউজিল্যান্ড। কিন্তু ব্রেন্ডন ম্যাককালাম করতে চাইলের আরও বড় কিছু। তিনি মেরে দিলেন বড়সড় এক ছক্কাই।

দিনেশ কার্তিক (কলম্বো, ২০১৮)
নিদাসাহ ট্রফির শেষ বলের সেই দুঃখ ভুলতে কত দিন যে লাগবে বাংলাদেশের! একটা বড় ট্রফি ধরা দিতে দিতেও হাত ফসকে বেরিয়ে যাওয়ার আরও একটা শোকগাথা লেখা হয়েছিল শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত তিন জাতির এই টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে। শেষ ওভারে ১২ রান দরকার, এই সমীকরণে সৌম্যের হাতে বল। সৌম্য দারুণ বল করলেনও। আগের ওভারে রুবেলের দেওয়া ২২ রানের ধাক্কা অনেকটাই সামলে দিলেন। শেষ বলে দরকার ৫ রান। চার হজম করলেও ভারতকে হারিয়ে ফাইনাল জেতার গৌরবে ভাসবে বাংলাদেশ। কিন্তু দিনেশ কার্তিক সেদিন অতিমানব হয়ে উঠেছিলেন। মেরে দিলেন ছক্কা!

এবং অন্যান্য
ক্রিকেট ইতিহাসে এই ম্যাচগুলো বিখ্যাত হয়ে আছে শেষ বলে ছয় মেরে দলের জয় ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য। তবে শেষ বলে ছয় মেরে স্কোর সমান সমান করার কীর্তিও আছে।
১৯৯২-৯৩ মৌসুম অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ল্ড সিরিজ প্রতিযোগিতায় পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার একটি ম্যাচে শেষ বলে ছয় মেরে ‘টাই’ করেছিলেন পাকিস্তানের আসিফ মুজতবা। স্টিভ ওয়াহর শেষ বলে সেদিন পাকিস্তানের জয়ের জন্য দরকার ছিল ১৭ রান। নব্বইয়ের দশকে পাকিস্তানের অন্যতম ‘ফিনিশার’ খ্যাতি পাওয়া বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মুজতবা ওয়াহর শেষ বলে বিশাল ছক্কায় দলকে জেতাতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু ম্যাচটা বাঁচিয়েছিলেন দারুণভাবেই। পরিসংখ্যান বইয়ের এই ম্যাচটা হয়তো ‘টাই’ হিসেবে লেখা, কিন্তু মুজতবার ছক্কাটি সেদিন পাকিস্তানকে দিয়েছিল জয়ের আনন্দই।

আরও একটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৮০-৮১ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ল্ড সিরিজ প্রতিযোগিতার সেই ম্যাচটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ বলে ছক্কা মারলেই টাই করার আনন্দ নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারত নিউজিল্যান্ড। কিন্তু অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল সেদিন তাঁর সতীর্থ, ছোট ভাই ট্রেভর চ্যাপেলকে দিয়ে যে কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তা কুখ্যাত হয়ে আছে ক্রিকেট ইতিহাসে। আন্ডার আর্ম বোলিং করে সেদিন নিউজিল্যান্ডকে বঞ্চিত করা হয়েছিল লড়াইয়ের অধিকার থেকে। তবে এই ঘটনাই ক্রিকেট থেকে চিরতরে দূর করেছিল ‘আন্ডার আর্ম’ বোলিং। এ জন্য চ্যাপেল ভ্রাতৃদ্বয় বড় একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন!

সূত্র : প্রথমআলো

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar