বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১, ০৯:৫৬ অপরাহ্ন

শিক্ষকের কারাবাস ও ভাবমূর্তির সংকট

কোটাবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখির কারণে কারাভোগ করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ৫৭ ধারায় মামলা ঠুকেছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে। এর আগে অবশ্য লেখালেখির কারণে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছিল ক্যাম্পাসে। নিরাপত্তা চেয়ে প্রক্টরের কাছে লিখিত আবেদনও করেন মাইদুল। অতঃপর মামলা, অন্তর্বর্তীকালীন জামিন এবং জামিন শেষে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের পর কারাবাস।

সবকিছুই এত দ্রুত ঘটে গেলে দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকে না। তবে কোন মামলাটি দ্রুত, কোন মামলাটি মন্থরগতিতে চলবে, আবার কোনটি একেবারেই স্থবির হয়ে থাকবে, তারও নিশ্চয় হিসাব-নিকাশ আছে। সেই হিসাব বুঝতে বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পরদিনই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কিন্তু মাইদুল ইসলাম যে প্রক্টরের কাছে একটি আবেদন জানিয়ে রেখেছিলেন, তার কী হলো? ছাত্রলীগ কোনো শিক্ষককে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারে কি না, কোনো ছাত্র শিক্ষককে হুমকি দিতে পারে কি না—এসব বিষয়ে প্রক্টরিয়াল বডিতে আলোচনা হয়েছে? শিক্ষকদের সুবিধা-অসুবিধা বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আছে। মাইদুল ইসলামের ব্যাপারে শিক্ষক সমিতি কোনো সভা আহ্বান করেছে বা বক্তব্য-বিবৃতি দিয়েছে, এমন শুনিনি।

অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের মতো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতিও দলীয় পরিচয়ে বিভক্ত। সমিতির নির্বাচনে লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, সাদা—নানা রঙের প্যানেল হয়। রং যা-ই হোক, দলীয় পরিচয় স্পষ্ট। সুতরাং পেশার মর্যাদা রক্ষা বা সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রেও দলীয় পরিচয়ের খোঁজ পড়ে। অবশ্য দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে এই বিভক্তি বর্তমান সরকারের আমলে হয়েছে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। এ রেওয়াজ চলছে দীর্ঘদিন ধরে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাইদুল ইসলাম সম্পর্কে নীরব ভূমিকা পালন করলেও দেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ জন শিক্ষক এক বিবৃতিতে এই ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন। কোটা সংস্কারের সমর্থনে ফেসবুকে নিজের মত তুলে ধরায় একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করা এবং সেই মামলায় তাঁকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাঁরা। এই শিক্ষকেরা খেদ করে বলেছেন, ‘…একটা সময়ে এই সমাজে শিক্ষকদের এমন প্রতিবাদী ভূমিকাকে যথোচিত এবং গৌরবজনক হিসেবেই গণ্য করা হতো।’

‘একটা সময়’ বলতে তাঁরা কোন সময়কে বোঝাতে চেয়েছেন জানি না। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান বা মুক্তিযুদ্ধের সময় ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীদের নিঃশঙ্ক ভূমিকার কথা স্মরণে রেখে বলি, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর আর কখনোই শিক্ষকসমাজের অভিন্ন ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আমরা দেখিনি।

মাইদুলের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা। কোটাবিরোধী আন্দোলনে উসকানি ও নেত্রীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার অভিযোগে এই মামলা। কিন্তু কোটাবিরোধী আন্দোলনকে আমলে নিয়ে সরকার এর সংস্কারে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সম্প্রতি। ফলে এই আন্দোলনের পক্ষে মত প্রকাশ করায় সরকার ও সরকারি দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে—এই অভিযোগ টেকে না। প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কোনো কটূক্তি মাইদুল ইসলাম করেছেন—এমন কোনো অকাট্য প্রমাণও নেই তাঁর ফেসবুকের দেয়ালে। দুই শব্দের একটি বাক্যকে ইঙ্গিতপূর্ণ মনে হতেও পারে, আবার ছিদ্রান্বেষণ না করে এটিকে এড়িয়েও যাওয়া যেতে পারে। ইংরেজি ভাষায় এ ধরনের শব্দ বা শব্দবন্ধকে পান (pun) বলা হয়। পানকে সাধারণত রসিকতা হিসেবেই গণ্য করা হয়। এটা গর্হিত অপরাধ কি?

কিন্তু সাবেক ছাত্রনেতা এটা নিয়ে যে মামলা পর্যন্ত গেলেন, তাকে সহিষ্ণুতার অভাব বা অত্যুৎসাহ মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাঁকে বরং দল ও নেত্রীর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল ও সমুন্নত রাখতে তাঁর নিজের সংগঠনের কর্মীরা কতটা আন্তরিক, সেই বিষয়টা ভেবে দেখতে বলি।

সারা দেশে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনটি যে ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে উঠছে, তাতে দলের ভাবমূর্তি যে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এ বিষয়ে সম্ভবত দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও দ্বিমত নেই। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা উপদলীয় কোন্দলে লিপ্ত হয়ে, নানা ধরনের উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের টেন্ডার বাগানোর জন্য সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন বিপন্ন করছেন, সর্বোপরি নিজেরাও সেই ভ্রাতৃঘাতী সহিংসতার বলি হচ্ছেন।

কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের দাপটের কাছে কর্তৃপক্ষও রীতিমতো অসহায়। এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ তুলে ধরতে পারি। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সপ্তাহ উপলক্ষে একটি বিতর্ক সভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেট থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা প্রতিযোগী, তাঁদের শিক্ষক ও অভিভাবকেরা। কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই এই বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। অনুষ্ঠান চলাকালে হঠাৎ করে মিলনায়তনে এসে হাজির হলেন একজন ছাত্রলীগ নেতা। বাইরের অনুষ্ঠান কলেজ মিলনায়তনে চলছে কেন—এই প্রশ্ন তুলে তিনি পণ্ড করে দিলেন অনুষ্ঠান। উপস্থিত সবাইকে বের করে দিয়ে মিলনায়তনে তালা ঝুলিয়ে বীরদর্পে বেরিয়ে গেলেন। অতিথি, প্রতিযোগী, দর্শক-অভিভাবক সবাই স্তম্ভিত! কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ অসহায়। ‘এটা অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ’ ধরনের নিরীহ মন্তব্য করে দায় সেরেছেন কলেজের অধ্যক্ষ।

চট্টগ্রাম কলেজে তখন ত্রিধাবিভক্ত ছাত্রলীগের কোনো কমিটি ছিল না। এই ঘটনার কয়েক দিন পর কমিটি গঠিত হয়েছে। তাতে দেখা গেল অনুষ্ঠান পণ্ড করেছিলেন যিনি, সেই ছাত্রনেতা পেয়েছেন সাধারণ সম্পাদকের পদ। এরই নাম হয়তো ‘বীরত্বের স্বীকৃতি’! কলেজ ছাত্রলীগের একটি অংশ আবার এই কমিটি মেনে নিতে পারেনি। তারাও এর প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘বীরোচিত’ভাবে। কলেজের প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে, প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে নতুন কমিটির প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে তারা। আগ্নেয়াস্ত্রসহ এই তরুণদের ছবি ও সাংগঠনিক পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। এতে দলের ভাবমূর্তি কতটা ‘উজ্জ্বল’ হয়েছে, তা বিবেচনা করবে কে?

এ রকম ঘটনা তো একটি-দুটি নয়, দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চিত্রই এ রকম। দল ও দলপ্রধানের ভাবমূর্তি যদি সংগঠনের নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ভিন্নমতাবলম্বী মাইদুল ইসলামদের বিরুদ্ধে মামলা করে বা জেলে ঢুকিয়ে কি তা পুনরুদ্ধার হবে?
বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক
[email protected] com

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar