বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৪:৩৩ পূর্বাহ্ন

রোবট নিয়ে ভয়ও আছে আকর্ষণও আছে

রোবট নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধির রোবট যদি মানুষের কাজের ক্ষেত্রগুলো দখল করে, তবে অনেকেই বেকার হয়ে পড়বে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোবট নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। মানুষের পাশাপাশি কাজ করবে রোবট। মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এতে মানুষ আরও সৃজনশীল কাজের সময় পাবে। রোবট নিয়ে মানুষের ভয় তাড়ানোর কাজ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। তারা এমন আকর্ষণীয়ভাবে রোবট তৈরি করছে, যাতে রোবট সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে যায়। তেমনই এক রোবট এরিকা।

বাদামি রঙের চুল আর পুতুলের মতো দেখতে এরিকাকে প্রথম দেখায় অল্প বয়সী এক মেয়ে মনে হবে। সম্প্রতি স্পেনের মাদ্রিদে এই রোবট একজনের সঙ্গে আলাপ চালিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, এরিকার ও তার মতো অন্যান্য রোবট এখন রোবটিক গবেষণার মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। কারণ, এগুলোর মানুষের মতো গঠনযন্ত্র ও মানুষের জীবনে সঙ্গে যুগলবন্দীতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ সপ্তাহে ইন্টেলিজেন্স রোবটসবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এ কথাই তুলে ধরলেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রদর্শনীতে এরিকা একজন চাকরিদাতা বা নিয়োগকর্তার ভূমিকায় একজনকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বিষয় উল্লেখ করেছ। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারবে?’

চাকরিপ্রার্থীর উত্তর হয়তো সবটা পর্যবেক্ষণ করতে পারবে না এরিকা। তবে বিশেষ বিশেষ শব্দ শনাক্ত করে তার জবাব দেওয়ার বিষয়টি তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

ওই সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘রোবট মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে বলে যে ভয় ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা ঠিক নয়। আমাদের জীবনে রোবট কখনো অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে না। রোবট আরও প্রীতিকর করে তুলতে তাদের গঠন ও কার্যক্রম মানুষের মতো করতে হবে যাতে আমাদের জীবনের সঙ্গে তাদের দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যায়।’

রোবট ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও জাপানের মনোবিদ হিরোকো কামিদে বলেন, আজ হোক কাল হোক মানুষের সঙ্গে সহ-অবস্থান করবে রোবট।

ফ্রান্সের সিএনআরএস সায়েন্টিফিক ইনস্টিটিউটের রোবটিক বিভাগের প্রধান ফিলিপ্পে সুয়েরেস বলেন, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে রোবটকে গ্রহণ করা মানে বিপদের ঝুঁকি ছাড়াই একাধিক কাজের উপযোগী যন্ত্রকে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগক্ষম করে তোলা। যেমন রোবট যেকোনো পরিস্থিতিতে নড়তে পারা এবং কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তা থামাতে সক্ষম। এ কারণেই মানবসদৃশ বা মডুলার সিস্টেমের রোবট পছন্দ করছে মানুষ। উদাহরণ হিসেবে বোস্টন ডায়নামিকসের তৈরি অ্যাটলাস রোবটের কথা বলা যায়। এটি বিভিন্ন ধরনের পৃষ্ঠে দৌড়াতে পারে। মাদ্রিদের ওই অনুষ্ঠানে মার্ক রেইবার্ট অ্যাটলাসের ডিগবাজি খাওয়ার ভিডিও দেখান।

অ্যাটলাসের মতো রোবট নিয়ে ভয় ও আশঙ্কার কথাও বলা হচ্ছে। এসব রোবটের ভবিষ্যৎ কাদের হাতে যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের অর্থায়নে তৈরি এই রোবটকে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ভবিষ্যতে যুদ্ধের জন্য তৈরি ‘কিলার রোবট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মাদ্রিদের ওই রোবট সম্মেলনে ‘ট্যালোস’ নামের একটি বিশেষ রোবট দেখানো হয়েছে। স্প্যানিশ কোম্পানি পাল রোবটিকসের তৈরি ট্যালোস রোবটটি ভারসাম্য রক্ষার বোর্ডের ওপর নিজেকে টিকিয়ে রাখার পরীক্ষা দিতে পারে।

গবেষকেরা বলছেন, মানুষসদৃশ রোবট হলে তাকে গ্রহণ করা সহজ হয়। মানুষ তার সক্ষমতা তার নড়াচড়ার ধরন আন্দাজ করতে পারে। এটা স্বস্তিদায়ক। তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে।

জাপানের গবেষক মাশারিও মরি তাঁর ‘আনক্যানি ভ্যালি’ তত্ত্বে বলেছেন, রোবট যদি মানুষের কাছে পরিচিত আকারের হয়, তবে তার প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখায়। তবে হুবহু মানুষের মতো দেখাতে শুরু করলে মানুষ তাকে বিরক্ত বোধ করে।

মাদ্রিদের মিগুয়েল স্যালিস নামের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, নিখুঁত মানুষের মুখ তৈরি করা সম্ভব নয়। এই অসম্পূর্ণতাই মানুষের পক্ষে রোবটকে বাতিল করার স্পৃহা জাগায়।

বর্তমানে জাপানে এরিকার মতো অনেক রোবট অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কাজ করছে। জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিরোশি ইশিগুরো বলেছেন, রোবট নির্মাতাদের কাছে মানুষের মতো করা বিষয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কারণ, এটি মানুষকে বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে মানুষের গঠন ও মানুষের কথা বলার বিষয়টি নিয়ে আরও গবেষণা করতে হবে।

ইশিগুরো বলেন, ‘আমরা রোবট দিয়ে মানুষকে বুঝতে পারি। যেমন চোখের পলক ফেলার বিষয়টির গুরুত্ব। এখন রোবট ও মানুষের মধ্যকার আলোচনার বিষয়টিকে উন্নত করতে মানুষের মতো রোবটগুলো সবচেয়ে সেরা। মানুষের মস্তিষ্ক যেমন মানুষ চিনতে পারে। মানুষের প্রাকৃতিক ইন্টারফেস ও মানুষই ধরা পড়বে।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এননাইসেন্সের প্রেসিডেন্ট জারগেন স্মিডহুবার বলেন, ‘মানুষের মতো হোক বা না হোক ভবিষ্যতে রোবট আমাদের অংশীদার হবে। তারা মানুষের অনুকরণের পাশাপাশি নিজেরাই পরীক্ষা চালিয়ে অনেক সমস্যার সমাধান আনবে। এ কাজে তাদের সাহায্য করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এতে মানুষে কোনো সাহায্য লাগবে না।’

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar