বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:৪৭ পূর্বাহ্ন

বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া হবিগঞ্জের ৮টি উপজেলায় শান্তিপূর্ণ নির্বাচন

মাতৃভূমির খবর ডেস্ক : বানিয়াচঙ্গের শাহপুর কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের সংঘর্ষ ॥ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে আহত হন প্রিসাইডিং অফিসার প্রভাষক জাহির আলম, পুলিশ কনস্টেবল জামাল উদ্দিন ও আনসার সদস্য আব্দুল মালেক ॥

আশঙ্কাজনক অবস্থায় কনস্টেবল জামালকে হেলিকপ্টারে ঢাকা পাঠানো হয় সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম, হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া হবিগঞ্জের ৮টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ মোতাচ্ছিরুল ইসলাম (আনারস), লাখাইয়ে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুশফিউল আলম আজাদ (নৌকা), চুনারুঘাটে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী আব্দুল কাদির চৌধুরী (নৌকা), বানিয়াচঙ্গে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী আবুল কাশেম চৌধুরী (নৌকা), মাধবপুরে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ মোহাম্মদ শাহজাহান (ঘোড়া), বাহুবলে স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ খলিলুর রহমান (ঘোড়া), নবীগঞ্জে আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ফজলুল হক চৌধুরী সেলিম (আনারস) ও আজমিরীগঞ্জে আওয়ামীলীগ মনোনীত প্রার্থী মর্তুজা হাসান (নৌকা)। গতকাল রাতে নির্বাচিত প্রার্থীদের ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ফজলুল জাহিদ পাভেল ও রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, রবিবার সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও বেলা ১১টার দিকে বানিয়াচং উপজেলার শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইকরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তাৎক্ষণিক ইকরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপরদিকে শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুর্বৃত্তরা ব্যালট পেপার ছিনতাই করে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে ইচ্ছামতো সিল মেরে জাল ভোট দিতে থাকে। এতে বাধা দিলে তাদের হামলায় কর্তব্যরত প্রিজাইডিং অফিসার প্রভাষক জাহির আলম, পুলিশের রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কনস্টেবল জামাল উদ্দিন, আনসার সদস্য আবদুল মালেকসহ ছয়জন আহত হন। হামলায় কনস্টেবল জামাল মাথায় আঘাত পান। আনসার সদস্য মালেক হাতে ব্যথা পেয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েন। অন্যদিকে জামাল অনবরত বমি করতে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে আহতদের হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মামুন খন্দকার জানান, ঘটনার পরপর শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার সব কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে। কোন প্রার্থীর লোক হামলা চালিয়েছে- আহত আনসার সদস্য আবদুল মালেকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন প্রার্থীর লোক হামলা চালিয়েছে তিনি জানেন না। হামলার পর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় হামলাকারীদের দেখতে পারেননি। পুলিশের সিলেট রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি জয়দেব ভদ্র জানান, শাহপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে মাথায় আঘাত পান কনস্টেবল জামাল উদ্দিন। এ ঘটনার পর তিনি অনবরত বমি করছিলেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা থেকে হবিগঞ্জে হেলিকপ্টার এনে কনস্টেবল জামালকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এ সময় হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা উপস্থিত থেকে কনস্টেবল জামালকে হেলিকপ্টারে ওঠান। কনস্টেবল জামালকে (কং- ৪৪৭) ঢাকা শেরেবাংলা নগর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। এছাড়া আনসার সদস্য আব্দুল মালিককে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মামুন খন্দকার জানান, ইকরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সাময়িক ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। অপরদিকে আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খন্দকার জানান, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাইর ঘটনায় ওই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। দুটি কেন্দ্র স্থগিত করা হলেও ওইসব কেন্দ্রে ভোট ফলাফলে কোন ব্যাঘাত ঘটায়নি। ওইসব কেন্দ্রের মোট ভোটের চেয়ে বেশি ভোট পাওয়ায় বানিয়াচঙ্গ ও আজমিরীগঞ্জের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে চুনারুঘাট উপজেলায় কয়েকটি কেন্দ্রে দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হন চনু মিয়া, ফুল মিয়া, কদ্দুছ মিয়াসহ আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবু তাহেরের ৪ সমর্থক। বিকেল ৩টার দিকে চুনারুঘাট উপজেলার মমিনপুর সেন্টারে জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ পেয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত লায়লা মিরা ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ সুলতান উদ্দিন প্রধানসহ স্ট্রাইকিং ফোর্স কেন্দ্রে গিয়ে জাল ভোট প্রদানকারীদের সরিয়ে দেন। সকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়তে থাকে। দুপুরে আবারও বিভিন্ন এলাকার কেন্দ্রগুলো ভোটারশূন্য হয়ে যায়। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অনেক নতুন ভোটার আনন্দ-উৎসাহের মধ্যে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করেন। অনেক বয়স্ক ভোটারকেও কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করতে দেখা গেছে। চুনারুঘাটের বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা বৃন্দাবন সরকারি কলেজ ছাত্রী নওরিন আক্তার জানান, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রথম ভোট দিতে এসেছেন। নিজের ভোট পছন্দের ব্যক্তিকে দিতে পারায় তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন। বিভিন্ন কেন্দ্রে তরুণ ভোটাররা তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। উল্লেখ্য ৫ম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে হবিগঞ্জের ৮ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ২৯, ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৩ ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩২ প্রার্থী প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী অধিকাংশ উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলের মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থীদের চেয়ে দাপট দেখিয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। ফলে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকার ভরাডুবির আশঙ্কা করছিলেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। গতকাল নির্বাচনে ৪টি উপজেলায় আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী, ২টি উপজেলায় আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও ২টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন। এদিকে, উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও ৪ উপজেলায় বিএনপির ৪ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেছেন। নির্বাচনে ৮ উপজেলায় ৮ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত ছিলেন। মোট ৬১৭টি কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৫ জন পুলিশ, ৭ হাজার ৪০৪ জন আনসার, ৩৬০ জন বিজিবি ও ১২৮ জন র‌্যাব সদস্য দায়িত্ব পালন করেন।

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar