শনিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:২৩ পূর্বাহ্ন

‘বাবা ব্যবসায়ী, আমি ব্যবসা করতে আসিনি’

‘দাদা কফি খাবেন?’ বেশ তদারকির ভাব বজায় রেখে জিজ্ঞেস করেন হলুদ টি-শার্ট পরা লোকটি। শুনে কুমার বিশ্বজিৎ যেন আকাশ থেকে পড়েন। উত্তরে বলেন, ‘ভাগ্যিস জিজ্ঞেস করোনি, খেয়ে এসেছি নাকি গিয়ে খাব।’ তারপর আদরমাখা স্বরে ধমক দিয়ে বলেন, ‘নিয়ে আসো আগে, তারপর দেখো খাই কি না।’

রোববার দুপুর। বাংলাদেশ টেলিভিশন মিলনায়তনের পেছনে কুমার বিশ্বজিৎ অপেক্ষা করছিলেন। গায়ে কালো রঙের পাতলা ফুলহাতা সোয়েটার। বুকের বেশ নিচে শুরু হয়েছে বোতামঘর। হাত আলতো গোটানো, কুমার বিশ্বজিতের সিগনেচার স্টাইল। গলায় ঝুলছে মোটা চেন। মিলনায়তন থেকে একটু পরপর সম্মিলিত করতালির শব্দ ভেসে আসছে। ঈদের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘পরিবর্তন’-এর শুটিং চলছে। কুমার বিশ্বজিতের ডাক পড়বে একটু পরই। ততক্ষণ তাঁর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ পাওয়া গেছে।

মিলনায়তনের পেছনে সেট তৈরির সরঞ্জাম যত্রতত্র ফেলে রাখা। একটা গুদামঘরের মতো। এই গুদাম পার হয়ে আসছেন শিল্পীরা। গুদামের মাঝখানে এক টুকরো খোলা জায়গা। একটা মাত্র চেয়ার। কুমার বিশ্বজিৎ আরও একটি চেয়ার চেয়ে পাঠালেন।

‘ঈদের কাজ তাহলে পুরোদমে চলছে?’ আলাপ শুরু করার চেষ্টা করি। কুমার বিশ্বজিতের বাঁ-হাতের অগ্রভাগ জিনসের পকেটে গুঁজে রাখা। মুখে আলতো হাসি, স্থির। টেলিভিশন অনুষ্ঠানে মজার গানগুলো গাওয়ার সময় এই হাসি তিনি ধরে রাখেন। হাসিটা মনে করিয়ে দেয়, ‘তুমি যদি বলো পদ্মা-মেঘনা একদিনে দেব পাড়ি’ কিংবা ‘ও ডাক্তার’ গানগুলোর কথা।

বিটিভির স্টুডিওতে কুমার বিশ্বজিৎ‘চলছে। গত ৩৬ বছর তো থামিনি। একনাগাড়ে কাজ করে যাচ্ছি। বাজারের জন্য বাজারের মতো করে কাজ করেছি, সেটাও কিন্তু না। আমি আমার কাজ করেছি। অনেক ভালোবাসা পেয়েছি মানুষের কাছ থেকে। এ আমার পরম পাওয়া। এই দীর্ঘ সময়ের অর্জন হচ্ছে, আমার শ্রোতাগোষ্ঠীর কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নেই। নির্দিষ্ট বয়সীদের জন্য কাজ করতে হবে, এমন কথা মাথায় রেখে কাজ করি না।’ বললেন কুমার বিশ্বজিৎ।

চেয়ার আসে না। সেট তৈরির সরঞ্জামের ওপর ভালোভাবেই বসে পড়া যায়। কিন্তু তিনি বসলেন না। শুনেছি, শিল্পী যত বড়, বিনয় তাঁর তত বেশি। আজ দেখা হলো।

আপনার ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, কিংবা ‘পুতুল’ কিংবা ‘তুমি রোজ বিকেলে’ গানগুলো এতকাল পরও মানুষ শোনে। কিন্তু এখনকার গানগুলো বেশি দিন টিকছে না কেন?

কুমার বিশ্বজিৎ বললেন, ‘টিকবে কীভাবে? সমসাময়িক হওয়ার নামে গানের ভেতর ভিনদেশি কালচার জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। সংস্কৃতিকে এভাবে শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেখবেন, যতই বলি বিশ্বায়নের যুগ, আমাদের শিকড় কিন্তু গ্রামে। এই যে কোরবানির ঈদ সামনে, রেলস্টেশনে যান, টিকিট পাবেন না। প্রতিটা নাড়ি কিন্তু গ্রামে পোঁতা। বাংলাদেশে যত গান সুপারহিট হয়েছে, তার মধ্যে ৯০ শতাংশ লোকগান। আধুনিক যে গানগুলো হিট হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক উপাদান ছিল। কাব্য ছিল, সাহিত্য ছিল, অন্ত্যমিল ছিল, সুর ছিল, গায়কি ছিল, কম্পোজিশন ছিল। সেগুলো তৈরির পেছনে সময়ও অনেক বেশি নেওয়া হতো, মাসের পর মাস। এখন আমাদের সময় খুব কম। ঈদ আসছে, কাজ করতে হবে, ভিডিও করতে হবে। এখানে যাঁরা বিনিয়োগ করতে আসছেন, যাঁরা আমাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন, তাঁরা কিন্তু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে আসছেন। তাঁরা আবার অনেক ক্ষেত্রেই ডোমিনেট করেন। বলেন, এরকম “চলছে” এখন। এই “চলছে” শব্দটা আমি পছন্দ করি না। আমি “চলার” পেছনে নাই। আমি শ্রোতার পেছনে ছুটতে রাজি নই, শ্রোতাকে আমার দিকে ফেরাতে চাই।’

কুমার বিশ্বজিৎ কথা বলে যাচ্ছেন নিজস্ব গতিতে। বেশিক্ষণ থেমে থাকা তাঁর বৈশিষ্ট্য নয়। মুখ থেকে কথা কেড়ে নিতে হচ্ছে। কাজটা হয়তো ঠিক হচ্ছে না। তবু নিতে হচ্ছে। ‘কিন্তু দাদা, শ্রোতা কম মানে তো বিক্রি কম…’

বললেন, ‘যখন অ্যালবাম বিক্রি হতো, ওই সময় আমার অ্যালবাম কম বিক্রি হয়নি। এখন আর অ্যালবাম বিক্রি হয় না। আর আমারও অনেক শ্রোতার দরকার নেই। আমার কাছে অনেক অবোধ শ্রোতার চেয়ে একজন বোদ্ধা শ্রোতা শ্রেয়। একজন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে আমার একটা দায়িত্ব আছে। সংস্কৃতি একটা দেশের আইডেনটিটি। আমি আমার ব্যবসা, জনপ্রিয়তার জন্য কালচারের মানটার সঙ্গে সমঝোতা করতে পারব না।’

খান যাঁরা বিনিয়োগ করছেন, যাঁরা গাইছেন, তাঁদের কী কী বিষয় মাথায় রাখা উচিত?
কুমার বিশ্বজিৎ বললেন, ‘বিনোদন থাকুক, সঙ্গে শৈল্পিক ব্যাপারটাও যেন থাকে। এ দুইয়ের সম্মিলনেই সংগীত। গান শুধু বিনোদনের বিষয় না। এখানে অনেক দায়িত্ববোধের ব্যাপার আছে। একটা গান আজ গাইলাম, মানুষ আনন্দ পেল, পরে ভুলে গেল, তাহলে চলবে না। এ জন্য আমি গতানুগতিক বা সমসাময়িক কাজ থেকে একটু দলছুট হয়ে দর্শকদের পিউর বাংলা গানের মধ্যে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করি। বাণিজ্যিক দিক থেকে না দেখে…যদিও আমার কাছে গান-বাজনা ব্যবসা নয়। সৃষ্টিশীল মাধ্যম, কিন্তু এর মাধ্যমে ব্যবসা দিতে হবে। যাঁরা অর্থলগ্নিকারী, তাঁদের ব্যবসাও দিতে হবে, পাশাপাশি শৈল্পিক ব্যাপারটাকে স্ট্যাবলিস্ট করতে হবে।’

মিউজিক ভিডিও নিয়ে আপনার মত কী?
‘ভিডিওর ওপর আমি খুব বেশি গুরুত্ব দিতে চাই না।’
কিন্তু এটা তো একটা বৈশ্বিক ধারা!
‘বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে যদি পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার কথা বলি; ওদের ভিডিওর একটা বিরাট বাজার আছে। ভাষার একটা ব্যাপার আছে। আমরা যে অনেক বেশি দর্শক পাচ্ছি, তা নয়। অর্থলগ্নিকারীরা ভিডিওতে চটজলদি একটা গিমিক দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। গান যদি ভালো হয়, লিরিক ভিডিও দিলেও কিন্তু সেটা কানে লেগে থাকে। গান তো দেখার নয়, উপলব্ধির বিষয়। আমি মনে করি, গান শুনতে হবে চোখ বন্ধ করে। গানের সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে কানের, চোখ খুলে দেখলে সেটা তো আর গান হলো না। ভিডিও মুখ্য হলে আমি শিল্পী হিসেবে মার খেলাম।’

মিলনায়তনের পেছনে এ সময়ের সংগীতশিল্পী কিশোর এসে হাজির হন। কুমার বিশ্বজিৎ জিজ্ঞেস করেন, ‘মাহাদি আর রাজিব কোথায় রে?’
‘স্যার রাজিবের পাস হয়নি। ও ক্যানটিনে, ভাত খাচ্ছে। মাহাদি আছে।’

বিশ্ব উইথ শিষ্য। মাহাদী, কুমার বিশ্বজিৎ, কিশোর ও রাজিব
‘কিশোর-মাহাদি-রাজিবদের সঙ্গেই কি পরিবর্তনে শুটিং?’
কুমার বিশ্বজিৎ বলেন, ‘হ্যাঁ। বিশ্ব উইথ শিষ্য। নতুনদের জন্য অনেক কিছু করেছি। নিজে একটা প্রডাকশন হাউস দিয়েছিলাম। এখনো বিভিন্ন রিয়েলিটি শো থেকে ওদের তুলে এনে অনুপ্রাণিত করি, ওদের জন্য গান করে দিই। কিছুদিন আগেও সমরজিৎকে দুটো গান করে দিয়েছি। ভারত থেকে রেকর্ডিং করে এনেছে। দারুণ গেয়েছে ছেলেটা। এই অঙ্গনে কেউ যদি আমাকে ডোমিনেট করে, সেটা মানব না। ডোমিনেট হতে চাই না বলেই অন্য কিছু করিনি। বাজারে যা চলছে, আমি তার মধ্যে যাব না। বাবা ব্যবসায়ী, আমি ব্যবসা করতে আসিনি। দেশের সংগীতে কিছু কনট্রিবিউট করব বলেই সৃষ্টিশীল কাজ করে যাচ্ছি।

কিশোরকে বললেন, ‘রাজিবকে ফোন দে, ছবি তুলব।’
‘স্যার, রাজিব এখনো ভাত খাচ্ছে। বুঝছি, ওর সঙ্গে এফএনএফ করতে হবে। আজকে ২০ বার ফোন দিছি।’
কুমার বিশ্বজিৎ বিস্মিত হওয়ার ভান করেন। বলেন, ‘এতক্ষণ ধরে ভাতই খাচ্ছে। এ দেখি ভাতের রাজা রাজিব!’
আমার দিকে ফিরে বলেন, ‘আমার জনপ্রিয় গানগুলো করব ওদের সঙ্গে। ‘রোজ বিকেলে’ আছে, ‘পুতুলের মতো’ আছে, ‘পাগল বলো’ আছে। আমার হাত ধরেই ওরা এসেছে। ভাবলাম ঈদে ওদের নিয়ে একটা ব্যতিক্রম কিছু করা যাক।

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar