শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন

গড়াপেটার নির্বাচনে জয়ী হবেন ইমরান?

সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ, চরমপন্থার পৃষ্ঠপোষকতা ও সন্ত্রাসী হামলার মধ্যই আজ বুধবার পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে হতে যাচ্ছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদলের আশা করা হলেও উদ্বেগের নানা কারণ বিদ্যমান। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতার হাতবদল দেশটির ইতিহাসে খুব অল্প সময়েই ঘটেছে। অনেকেই বলছেন, ইমরান খান কি পাকিস্তানের নতুন মুখ হতে পারবেন? আবার অনেকের আশঙ্কা, যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা উদ্‌যাপনের কোনো কারণ নেই। দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ম্যাচ ফিক্সিংয়ের নির্বাচনে জয়ী হতে যাচ্ছেন ইমরান খান।

প্রায় দুই কোটি নতুন ভোটারসহ ১০ কোটি ৬০ লাখ ভোটার নতুন প্রধানমন্ত্রী বেছে নেবেন। পুরো বিশ্বের নজর থাকতে পারে এ নির্বাচনে। কারণ, পাকিস্তানে পরিবর্তন আসবে, নাকি সেই জলপাই শাসনের কবলেই থেকে যাবে, তা-ও জানা যাবে। স্থানীয় সময় সকাল আটটায় শুরু হয়ে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ভোট হবে। রাত আটটা নাগাদ জানা যাবে, কোন দল শাসন করবে পাকিস্তানকে। গার্ডিয়ানের এক কলাম লেখক এই নির্বাচনকে ‘ন্যাস্টি ইলেকশন’ বলে মন্তব্য করেছেন।

অধিনায়ক ও বোলার হিসেবে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দিয়েছেন দেশটির একসময়ের প্লেবয় ইমরান খান। রাজনীতিবিদ হিসেবে আজ অনুষ্ঠিত দেশটির সাধারণ নির্বাচনে তেমনই আরেকটি জয় ঘরে তুলতে যাচ্ছেন তিনি। বিভিন্ন জরিপের ভিত্তিতে এ কথা বলাই যায় যে ইমরানের পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এ নির্বাচনে আসনসংখ্যার ভিত্তিতে সবচেয়ে বড় দল হতে যাচ্ছে। ইমরান খান হতে যাচ্ছেন দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন পুরোদস্তুর খেলোয়াড় হিসেবে এতে কি ইমরান খান নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। কারণ, ম্যাচ জালিয়াতি করা হয়েছে। ইমরান খান ও সেনাবাহিনীর ম্যাচ পাতানোর কথা বারবার অস্বীকার করে আসছে।

সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে পিটিআই গণমাধ্যমে বিশেষ অধিকার পেয়ে থাকে, ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুমোদন পায় এবং এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো থেকে তারা এগিয়ে আছে। দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও তাঁর মেয়ে মরিয়ম নওয়াজ লন্ডন থেকে ফিরে পাকিস্তানে পা রাখতেই ১৩ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। পিটিআইয়ের তুলনায় হয়রানি ও গ্রেপ্তার অন্য দলের কর্মীরা বেশি হয়েছে। তাদের ওপর চাপও বেশি। আরও স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, হত্যার চেষ্টা এবং সন্ত্রাসী হামলাও বেশি হয়েছে পিটিআইয়ের চেয়ে অন্য দলগুলোর ওপর। ১৩ জুলাই বেলুচিস্তানে এক সমাবেশে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ১৪৯ জন নিহত হয়েছেন, তাঁরা সবাই স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী।

প্রায় জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তানের রাজনীতির লাগাম জেনারেলদের হাতেই রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন এবং নির্লজ্জভাবে হস্তক্ষেপও করেছেন। আর এ কারণে দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্থিতিশীল গণতন্ত্রের বিকাশও দেশটিতে হয়নি। এই ব্যর্থতার কারণে তার পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যের অগ্রগতিতে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে পাকিস্তান।

খাকি আম্পায়ার
১৯৭০ দশকে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সময় অথবা ১৯৯০-এর দশকে নওয়াজ শরিফ প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে সেনাবাহিনীর ‘জিপওয়ালা’রা প্রথম রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন দিয়ে বেসামরিক লোক হয়েছিলেন। ২০০৮ সাল থেকে টানা ১০ বছর পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশটির শাসনক্ষমতা হাতে নেয়নি। ফলে রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘ বহু দিন ক্ষুধার্ত, শুধু সময়ের অপেক্ষায় আছে বলা যায়।

পাকিস্তানের সর্বশেষ নির্বাচনে নওয়াজ শরিফ পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ক্ষমতাচ্যুত হন নওয়াজ। আজীবনের জন্য রাজনীতি থেকেও তাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়। বিদেশে থাকা সম্পদ গোপনের মামলায় ১০ বছর সাজা হয় নওয়াজের। পাকিস্তানে ফেরার পর কারাগারে আছেন নওয়াজ শরিফ। নিম্ন আদালত তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এরপর থেকে ভদ্র এক রাজনীতিবিদ থেকে নওয়াজকে শহীদ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে সেনারা কেন তাঁর বিরুদ্ধে বা কেন তিনি সেনাদের বিরাগভাজন, তা কেউ জানেন না। সম্ভাব্য কারণ হতে পারে ভারতের ব্যাপারে একগুঁয়েমি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত এবং ইসলামপন্থীদের প্রতি নওয়াজের মনোভাব।

ইমরান খান নিজেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতিবিদ হিসেবে দাঁড় করাতে গিয়ে দুর্নীতিপরায়ণ হওয়ার কারণে নওয়াজের পিএমএল-এন এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে (পিপিপি) প্রতিদ্বন্দ্বী বানিয়েছেন। পিপিপির বেনজির ভুট্টোকে ২০০৭ সালে হত্যা করা হয়। বিদেশ বিশেষ করে আমেরিকার প্রতি ইমরান খান কম আগ্রহ দেখান। পাকিস্তানের অনেকেই মনে করেন, ইমরান খান চরমপন্থীদের সঙ্গে জোট গঠন করবেন।

আগের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনের একটি বিষয় লক্ষণীয়, তা হলো সেনাবাহিনীর ম্যাচ ফিক্সিং। বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং দেশের বেশির ভাগ গণমাধ্যম বলছে, তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে অথবা জোর করা হচ্ছে যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চেয়ে ইমরানের পিটিআইয়ের প্রার্থীদের বেশি প্রচার দিতে উৎসাহ করা হচ্ছে। ১৬ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের বেসরকারি সংস্থাগুলো বলে যে নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারা সতর্ক করে দিয়ে বলে, নির্বাচনের ফলাফলে হস্তক্ষেপের অশান্ত চেষ্টা চলছে।

পাকিস্তানের ভোটাররা জেনারেলদের ভর্ৎসনা করেন। তবে বাইরে থেকে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে সামান্য কিছুই করা সম্ভব। ইমরান খান, যিনি এখন সেনাবাহিনীর সহায়তায় তুষ্ট, তাঁর সচেতন হওয়া উচিত, কারণ আগামী দিনে পাকিস্তানের জেনারেলরা যখন কিছু চেয়ে বসবেন, বিপত্তি বাধাবে তখনই।

জিপওয়ালাদের মনে রাখা দরকার, দেশ রক্ষার দাবিতে তাঁরা যা যা করেন, তা তাঁদের ক্ষতিই করছে। গত ৭০ বছরে যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, সামরিক অভ্যুত্থান, অস্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় চরমপন্থীদের কারণে পাকিস্তানের অবস্থা জেরবার। ক্রিকেট, অর্থনীতিসহ নানান দিকে ভারতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে পাকিস্তান।

নির্বাচনের পরিবেশ ও বর্তমান অবস্থা দেখে পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক হুসেইন হাক্কানি এএফপিকে বলেছেন, ‘নির্বাচনে ফল যা-ই হোক না কেন, ২৫ জুলাইয়ের নির্বাচন পাকিস্তানে শুধু অস্থিতিশীলতা বাড়াবে। এ নির্বাচন হবে এমন, যাতে আসলে কেউই জিতবে না।’

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar