ঢাকা ০৬:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কুষ্টিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালন প্রতিবন্ধীকতাকে জয় করে অনেকেই সফলতা লাভ করেছেন ……ডিসি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পট চর হেয়ার ও সোনারচর। ২ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে বিদায় সংবর্ধনা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন টঙ্গী পূর্ব এবং পশ্চিম থানা । সম্মেলনের নামে আওয়ামী লীগকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই,,,,,,, ফারুক খান।। বিএনপি- জামায়াতের নৈরাজ্য ঠেকাতে প্রস্তুত আছি- আসিফ আহম্মেদ আনিস মালদ্বীপে আলোকিত চাঁদপুর সংগঠনের সংবর্ধনায় কাজী হাবিবুর রহমান লাঠি খেলা উৎসব ২০২২ উপলক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন পুলিশের মবিলাইজেশন কন্টিনজেন্টের বার্ষিক মহড়ার উদ্বোধন কমলগঞ্জে দোকানে চুরি, ১১ চোরাই মোবাইলসহ গ্রেফতার ১ বাকেরগঞ্জে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার-৩

গ্রন্থ আলোচনা -সাঈফ ফাতেউর রহমান গ্রন্থের নামঃ মাটির টানে গ্রন্থের প্রকৃতিঃ ছড়া কাব্য গ্রন্থ

গ্রন্থকারঃ শাহানাজ পারভীন শিউলী
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০২২
স্বত্বঃ লেখক
প্রকাশকঃ বইবাড়ি প্রকাশন
৩১/১ শ্রীশ দাস লেন, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ জি এস সাগর
মুদ্রণঃ জনতা প্রিন্টার্স
অনলাইনে বই পেতেঃ www.rokomari.com/ isamoti
ছড়া সংখ্যাঃ ৫০
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৫৬
মূল্যঃ ১৫০টাকা

শাহানাজ পারভীন শিউলী সুপরিচিত ছড়াকার ও কবি। গদ্য রচনা এবং গ্রন্থালোচনাতেও তিনি স্বচ্ছন্দ্য। রম্য রচনাতেও তাঁর পারঙ্গমতা সুবিদিত। ইতোমধ্যেই বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তিনি যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছেন। দেশের প্রধান দৈনিক সমূহের সাহিত্য পাতা, সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের বাইরেও ভারত এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রিত বাংলা পত্রিকা/ সাময়িকীতে তিনি নিয়মিত লিখছেন। অনলাইন পত্রিকাগুলিতেও তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি। ছড়ার পাশাপাশি জীবনমুখি এবং নান্দনিক কবিতা সৃজনেও তিনি কুশলী দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। শিক্ষাদানের মহান ব্রতে নিয়োজিত এই সৃজনশীল কবি একাগ্র নিবেদনে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, শুদ্ধাচার, শুভব্রত এবং সামাজিক সুষম সুবিন্যাসে নিয়মিত একাগ্রতায় কাজ করে চলেছেন।

বক্তব্য প্রকাশে কবিতা এবং ছড়াকেই কবি শাহনাজ পারভীন প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ছড়ায় জীবনের অমিয় সত্যোচ্চারণ, প্রতিবাদ, দ্রোহ এবং জনজীবনের প্রত্যাশা-স্বপ্ন-মানবীয় সুস্বর উপস্থাপনের পাশাপাশি তিনি জীবন চাহিদা, বাস্তবতার সাথে অসঙ্গতির দ্বৈরথ, সু এবং কু এর নিয়ত দ্বন্দ্বমানতা অপার সুমিত বোধে উপস্থাপন করেছেন। জীবনের সাথে, জন-আকাঙ্খার সাথে অঙ্গাঙ্গী মিশে যান তিনি। আর তাই তার ছড়াগুলি তীর্যকতার পাশাপাশি সহৃদয় অন্তর-বিভাসে সুরভিত হয়ে ওঠে। সুচৈতন্যের প্রভালোকে গীতল জীবনের আহ্বান এবং বৈরিতার অপনোদনে এক সুহাস সুন্দরের আবাহণী তাঁর ছড়াগ্রন্থের বাণীতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে।

“মাটির টানে” ছড়াগ্রন্থে কবি শাহানাজ পারভীন নিজ স্বদেশের মাটির অন্তরাত্মার স্পন্দনে সুরভিত হয়ে ওঠেন। চৈতন্যের সামগ্রিকতা জুড়ে শুদ্ধবোধ ক্রীড়াময় থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সফল অভিযাত্রায় বিজয়ের চেতনা তাঁকে উদ্বেলিত করে। ভাষা চেতনা তাঁকে প্রবলভাবে আত্মসচেতন করে তোলে। জনতা জীবনের সখ্যে সমর্পণ করেন নিজেকে। প্রকৃতির সুরম্যতায় আনন্দাপ্লুত হয়ে ওঠেন। ক্ষুদ্রতর, তুচ্ছতর সকল কিছুর মাঝ থেকেই জীবন সুন্দরের আশীর্বাণী অন্বেষণ করেন। পরিপার্শ্বের অমল সুশোভনতা তাঁকে আপ্লুত করে। রং রূপ বিভার অপরূপ উদ্ভাসের যাপিত জীবন এবং তার সকল সম্পদ এবং সীমাবদ্ধতার সাথে নিজেকে আত্মীকৃত করেন। আর তাই এই দেশ, এই সমাজ, এই মানুষেরা তাঁর আত্মার আপন হয়ে ওঠে। তিনি মাটির মানুষ হয়ে সম্পন্ন বিভায় উন্নত মস্তক হয়ে ওঠেন। প্রগাঢ় চেতনালোকে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন মাটি-শুদ্ধ অমলিন শুভ্র বাংলাদেশ।

নিজ আত্মজ ও আত্মজাকে উৎসর্গীকৃত এই শিশু কিশোর ছড়া কাব্যগ্রন্থ একটি সুখপাঠ্য ও মানস জাগৃতিমূলক সৃজন। ছড়া-কাব্যগ্রন্থটির প্রথম নির্মিতি “মাটির টানে” অনুসারেই গ্রন্থের নামকরণ। এখানে কবি বলেন-
“সোনার দেশের সোনার মাটি
কিনছি সবাই বেশি দামে,
বুক পাঁজরে যত্ন করে
আগলে রাখি রক্তঘামে।

“শক্তি সাহস ভালোবাসায়
এমন দেশ নেইতো আর,
এই দেশেতে জন্ম নিয়ে
মরতে পারি হাজারবার।“
দেশ মাতৃকার প্রতি এই অঙ্গীকার ও প্রত্যয়ের চৈতন্যালোকই গ্রন্থটির আদ্যন্ত সুরময়তায় পরিব্যাপ্ত।

“ফাগুন মাস” কবিতাটা অপরূপ ফাগুন বন্দনার পাশাপাশি মাতৃভাষা আন্দোলনে আর এক ফাগুন দিনে দেশপ্রেমী, ভাষা প্রেমী তারুণ্যের স্মৃতি-স্মরণে সুস্বর।
“ফাগুন মাসে শিমুল পলাশ
রঙিন করে বন,
ভাই হারানো দুখের ডালি
দহন করে মন।
“রক্তে ভেজা বর্ণমালা
শহীদ ভাইয়ের দান
ফাগুন আমার মায়ের ভাষা
গর্বে ভরে প্রাণ।“

“এসো শিখি” কবিতাটি প্রকৃতির সকল অনুষঙ্গই প্রতিনিয়তই আমাদেরকে যে প্রেষণা ও প্রেরণা দিয়ে চলেছে তারই নান্দনিক সুন্দর প্রতিভাস।
“সূর্য বলে আঁধার ঢেকে
আলোর পথে চলো,
চাঁদ বলে, সুখে দুখে,
মনের কথা বলো।
“আকাশ বাতাস নদী বলে
জীবন ছবি আঁকো,
আগুন বলে, পাপ পুড়িয়ে
সবার সাথে থাকো।“

আমাদের হৃদয়ের রং এবং ভাষা চেতনার অগ্নিশপথের বাঙ্ময়তার সুপ্রকাশের মাসে লা আবিরে ছেয়ে যাওয়া দিগঞ্চলের অনবদ্য পরিবেশনা “কৃষ্ণচূড়া”।
“ যে দেখ্য নগ্ন পায়ে
আসছে মিছিল সারি সারি
হৃদয় হরিৎ উপত্যকায়
ঢেউ খেলছে ফেব্রুয়ারি।“

“ নজরুল” শিরোনামের লেখাটি জাতীয় কবি এবং জনচেতনার প্রতীক কবি নজরুল স্মরণে সম্পন্ন সুরভিত নির্মিতি।
“ভাঙ্গলো শিকল লৌহ কপাট
আসলো নিয়ে ঝড় তুফান,
অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি
সর্বহারা, ভাঙ্গার গান।
———- কৃষক, শ্রমিক, কুলি-মজুর
ধনিক শ্রেণীর উঠলো রব,
সবার উপরে মানুষ সত্য
ঘুচিয়ে দিলো বজ্জাতি সব।“

“নতুন দেশ” এ প্রতীকি রূপ ব্যাঞ্জণায় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-সন্তোষ-নিরাপত্তা শোভিত প্রার্থিত আবাস-স্বপ্নের আলোকিত উদ্ভাস।
“নতুন দেশে যাব আমি
ফুল পরীদের সাথে,
নির্ভাবনায় ঘুমায় যারা
সুখে নিশুত রাতে।
নেইকো যেথায় অনাহারী
দুঃখ ভরা মুখ,
সবার দুঃখে কাতরতায়
বিলাই নিজের সুখ।“

“বাংলার রূপ” এ আমাদের শ্যামল শোভনতার মায়াময় রূপময় অনিন্দ্য স্বদেশকে আত্মার অঙ্গীকারে আবদ্ধ রাখার শুদ্ধ প্রত্যয়।
“সকল দেশের সেরা এ দেশ
বুক পাঁজরে রাখি ধরে,
সোনার মাটি অঙ্গে মেখে
মরতে পারি গর্ব করে।“

“যুদ্ধে যাব” এক অদম্য জীবনবাদীর দেশপ্রেমের চেতনায় শুদ্ধীকৃত চৈতন্যের সকল অপ-অনাচার অপনোদনে অভয় সন্মুখযাত্রার অনড় সুচেতনা।
“তোমার চোখে দেখবো মাগো
প্রথম সূর্যোদইয়,
অনিমিখের দু’চোখেতে
রাখবো না আর ভয়।
————–তোমার চোখের অগ্নিশিখায়
পুড়বে পশুর দল,
লক্ষ মানুষ তোমায় দেখে
ফেলবে খুশির জল——————।“

“মার্চ” ছড়া-কবিতাটিতে কবি আমাদের আনন্দাশ্রু আর রক্তবণ্যায় স্মিত জীবন বাস্তবতার মাসকে চিত্রিত করেছেন প্রকৃত আনন্দ-বিধূরতার পরিম্লান জোছনাভাসে।
“মার্চ আমার কান্না হাসির মাস
শোকের মিছিল ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস,
ভাই হারিয়ে কাঁদে শোকে বোন,
মার্চ আমার মায়ের পোড়া মন।——————-
————মার্চ আমার শিকল ভাঙ্গার গান
সকল দেশের গর্বে ভরা মান,
মায়ের আঁচল লাল সবুজে আঁকা
মার্চ আমার বিজন ব্যথা ঢাকা।

“জাগো তরুণ” আলোকিত তারুণ্যের নবপ্রভা মহা উত্থানের আহ্বানে মুখর সঞ্জীবণী।
“———-কী হবে আর এমনি বেঁচে
বাড়িয়ে দেহের আয়ুষ্কাল,
তোমরা তরুণ দুঃসাহসী
আঁকবে চোখে স্বপ্নজাল।—————
তোমরা তরুণ আলোর প্রভা
রাখবে মনে মায়ের ঋণ,
মাড়িয়ে দিয়ে আঁধারটাকে
আনবে কেড়ে শুভ দিন।“থাকি”

“ হাসি খুশি পরিপাটি” ছড়া-কাব্যটি স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণে সুস্থ সবল প্রাণোন্নত থাকার প্রত্যয়। লক্ষণীয় যে, এই ছড়াটি সহ অনেক ছড়াতেই কবিতা-স্নিগ্ধতার পাশাপাশি জ্ঞান উন্মীলন ও চেতনা জাগানিয়া বক্তব্যকে আন্তরিক প্রয়াসে সংবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
থাকবো সবাই সারাক্ষণ,
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে
সুস্থ রাখি দেহ মন।——————–
—-নিয়ম মাফিক ঘুম বিশ্রামে
শরীরটাকে সতেজ রাখি
শরীরচর্চা খাদ্যাভাসে
আসুন সবাই সুস্থ থাকি।“

“ভিটামিন” শীর্ষক ছড়া-কাব্যটিও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নীরোগ থাকা এবং সবলতার প্রয়োজনে যথাযথ খাদ্য নির্বাচনের বিজ্ঞানসম্মত তথ্য উপস্থাপন। তবে সুচারু উপস্থানার কারণে তা আকর্ষণীয় সুনিশ্চিত।
“টাটকা সবুজ শাকসবজি
গাঁজর, আম খেলে সাথে,
দেহের বৃদ্ধি, দৃষ্টিশক্তি
রোগ প্রতিরোধ বাড়ে তাতে।————————–
——হাঁড়, দাঁত গঠন করে
ক্যালসিয়াম আর ফসফরাস,
হজম শক্তি বৃদ্ধি করে
যে খাবারে আছে আঁশ———————।“

“মানুষ হতে চাই” দেশপ্রেমের চেতনায় অমৃত শুভচেতনার উদ্বোধন।
“মানুষ হতে চাই যে মাগো
ক্ষুদিরামের মতো,
করবো ঘায়েল এদেশ থেকে
জালিম আছে যতো।————–
——আসবে ফিরে আবার দেশে
সুকান্ত, নজরুল
উপড়ে দেবো যেথায় আছে
দেশদ্রোহীর মূল————————-।“

“একটি ভাষণ একটি স্বাধীনতা” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’এর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ’এর ভাষণ, এর প্রেক্ষিত এবং ভাষণোত্তর আন্দোলিত স্বদেশের অপরূপ চিত্রায়ন।
“৭ই মার্চের মুক্তিডাকে
লাখো মানুষ আসলো ছুটে
মাঠ কাঁপানো সেই ভাষণে
রক্তে আগুন উঠলো ফুটে।
একটি কথায় বাঁধলো তারা
শক্তি, সাহস, বুকে বল,
ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ো
মুক্তিকামী বীরের দল————————।“

“মা দিবস”ছড়া-কাব্যটিতে মাতৃপ্রীতি ও কর্তব্যবোধকে কেবলমাত্র একটি দিবস-কেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না রাখার প্রত্যয়।
“যুগ, বছর, মাস, তারিখ
সবই আমার মায়ের দিন,
গায়ের চামড়ায় বানালে জুতা
শোধ হবে না মায়ের ঋণ———————-।“

“বৃক্ষ” অসামান্য সুচেতনায় মানব অস্তিত্বের স্বার্থেই বৃক্ষের অপরিহার্যতার উপস্থাপন।
“বৃক্ষ সবার শ্রেষ্ঠ বন্ধু
নিরবে সে করে দান,
অক্সিজেনের যোগান দিয়ে
বাঁচিয়ে রাখে সবার প্রাণ।———————–
———বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে
পরিবেশকে রক্ষা করি,
সবুজ শ্যামল ধরার মাঝে
রোগমুক্ত জীবন গড়ি।“
হৃদ উদ্ভাসের অনন্যতায় আলোকিত ছড়া-কাব্য “বিজয় আমার”। আমাদের মনন সুবিকাশে বিজয়ের চেতনা প্রোথনের শুদ্ধাচারী প্রকাশ।
“——-বিজয় আমার ঐক্য জোড়া হাত
আঁধার-আলোর গল্প বলার রাত
কপাল জুড়ে মায়ের আঁকা চুমি
বিজয় আমার স্বাধীন মাতৃভূমি।“

“ পথ শিশু” ছড়্রা-কাব্যটি সুবিধা বঞ্চিত পথশিষুদের দুরাবস্থা, দৈন্য, অবহেলা এবং সামাজিক অসঙ্গতির ব্যাদিচারী বাস্তবতার প্রতি তীব্র কষাঘাত।
“ঐ যে দেখো পথের ধূলোয়
নগ্ন দেহে কাঁদছে শিশু,
দাঁড়িয়ে আছে হাতটি পেতে
চাওনা ফিরে একটু পিছু।“—————–।“

পরিবেশ দূষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পারিবেশিক ভারসাম্য বিষয়ে ক্ষমাহীন ঔদাসীন্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় “খোকার ভাবনা”ছড়া-কবিতায়।
“মাগো, এখন পাইনা কেন
খালে বিলে মাছ
উজাড় হয়ে যাচ্ছে কোথায়
সারি সারি গাছ!——————————।“

“অক্ষর “ মাতৃভাষার বর্ণমালা-মমতার সুস্বর উচ্চারণ
“ অ আ ক খ
পড়ছি অবিরাম
মন ভরে যায় ডাকো যদি
এই অক্ষরে নাম।———————।“

“জন্মভূমি” নিজ মাতৃভূমির প্রতি অন্তঃস্থ অনুভব ও শ্রেয়তর বোধের সঞ্জীবণী।
“বাংলা আমার জন্মভূমি
সুখের অনুক্ষণ
তোর জঠরে জন্ম নিয়ে
ধন্য আমার মন।—————————।“

“মাটির টানে” কিশোর ছড়া কাব্য গ্রন্থে কবি শাহানাজ পারভীন শিউলী শিশু কিশোরদের উপযোগী করে সরল সুবোধ্য আকর্ষণীয় ভাষায় বিবিধ বিষয় তুলে ধরেছেন। ছড়া আঙ্গিকের এই কবিতাগুলি শিশু কিশোরদের মাঝে সুচেতনা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে নিশ্চিতই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শুদ্ধ সুজীবনের প্রতি তাদের অঙ্গীকার ও আকাঙ্খা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। জীবন শোভনতা, সম্প্রীতি, হার্দ্যিকতা আর পরষ্পরের সাথে আন্তরিক সহাবস্থানের মনোভাব জাগ্রত হবে। মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণ প্রবল হবে। দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হবে। মানুষ ছাড়াও সর্বজীবের প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতার মনোভাবে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কবি শাহানাজ পারভীন শিউলী’এর পূর্ববর্তী শিশু কিশোর ছড়া-কাব্যগ্রন্থ “ডাংগুলি” যেমন বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় বিবিধ বিষয়ের অবতারণায় মানস বিকাশে অবদান রেখেছে, বর্তমান গ্রন্থটিও একই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। শিশু অবস্থা থেকে জীবন পর্যায়ে উত্তরণের বিবিধ ধাপে মানস বিকাশ ও সমৃদ্ধি, সুচেতনা এবং শুদ্ধ জীবনবোধের বিকাশের মাধ্যমেই মানুষ পরিপূর্ণ দেশব্রতী, হিতবাদী, আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠে। নিষ্ঠায় এবং একাগ্রতায় শাহানাজ পারভীন শিউলী জাগৃতির এই মহিমাময় কাজটিই নিরলস করে চলেছেন। কর্মসূত্রে শিক্ষাদানের মহতী পেশার সাথে মনন ও মানসের আলোক প্রদীপ্তি তাঁকে আলোকিত মানুষ গড়ার প্রয়াসে উজ্জীবিত রেখেছে। আর অন্তর্গত সেই সুমিত বোধের সমুজ্জ্বল প্রেরণাতেই তিনি নিরলস দেশ, মাটি, প্রকৃতি, ঋতু পরিক্রমা, নদী, বন, সমাজ ও জীবনানুষঙ্গের সকল কিছুকেই সুবোধ্য স্নিগ্ধতায় উপস্থাপন করে চলেছেন।

কবি শাহানাজ পারভীন শিউলী’র শিশু কিশোর ছড়া-কাব্যগ্রন্থ “মাটির টানে” ঋতু বৈচিত্র্যস্মিত বাংলাদেশের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেবে। প্রকৃতির সকল উপাদান, বৃক্ষা-লতা-পাতা-পাখি-পশুদের সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী গড়ার প্রণোদনা দেবে। দেশকে ভালোবেসে মহত্তর সৃজণালোকে উজীবিত করবে। নৈতিক সুবিকাশে আস্থাশীল করে তুলবে। শিশু কিশোর কেবল নয়, সুচেতনার সকল মানুষের কাছেই এটি উপভোগ্য ও আদৃত হবে। ।

কবি’র প্রথম প্রকাশনা “ডাংগুলি” এর প্রকাশকই এই গ্রন্থটির প্রকাশক। একই রকম অমনোযোগেরই পুণরাবৃত্তি ঘটেছে এই প্রকাশনাটিতেও । প্রুফ সংশোধনে শৈথিল্য পীড়াদায়ক। ছড়া-কবিতাগুলির সাথে সংযুক্ত ছবিগুলি আরও একটু আকর্ষণীয় ও বিষয়ানুগ করা যেত। কাগজের মান উন্নততর হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিলো। তবু সামগ্রিকভাবে কিছু সীমাবদ্ধতা সত্বেও এটি একটি শুভ কর্ম্যোদ্যোগ। সঙ্গতভাবেই তাই আমি কাব্যগ্রন্থটির ব্যাপক সাফল্য এবং বহুল পাঠ কামনা করি।

————————-
লেখক পরিচিতিঃ
ড. সাঈফ ফাতেউর রহমান।
শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক,
(২০টি একাডেমিক গ্রন্থ প্রণেতা, প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৩২টি, কাব্যগ্রন্থ আলোচনা গ্রন্থ ০৩টি। প্রকৃতি বিষয়ক গ্রন্থ ০৪টি)।
লাল মাটিয়া, ঢাকা
ইমেইলঃ [email protected]
ইমেইলঃ ০১৭১৫৩৭৩৭০১

Tag :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কুষ্টিয়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস পালন প্রতিবন্ধীকতাকে জয় করে অনেকেই সফলতা লাভ করেছেন ……ডিসি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম

গ্রন্থ আলোচনা -সাঈফ ফাতেউর রহমান গ্রন্থের নামঃ মাটির টানে গ্রন্থের প্রকৃতিঃ ছড়া কাব্য গ্রন্থ

আপডেট টাইম ১২:০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২

গ্রন্থকারঃ শাহানাজ পারভীন শিউলী
প্রথম প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২০২২
স্বত্বঃ লেখক
প্রকাশকঃ বইবাড়ি প্রকাশন
৩১/১ শ্রীশ দাস লেন, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০
প্রচ্ছদ ও অলংকরণঃ জি এস সাগর
মুদ্রণঃ জনতা প্রিন্টার্স
অনলাইনে বই পেতেঃ www.rokomari.com/ isamoti
ছড়া সংখ্যাঃ ৫০
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৫৬
মূল্যঃ ১৫০টাকা

শাহানাজ পারভীন শিউলী সুপরিচিত ছড়াকার ও কবি। গদ্য রচনা এবং গ্রন্থালোচনাতেও তিনি স্বচ্ছন্দ্য। রম্য রচনাতেও তাঁর পারঙ্গমতা সুবিদিত। ইতোমধ্যেই বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তিনি যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছেন। দেশের প্রধান দৈনিক সমূহের সাহিত্য পাতা, সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের বাইরেও ভারত এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রিত বাংলা পত্রিকা/ সাময়িকীতে তিনি নিয়মিত লিখছেন। অনলাইন পত্রিকাগুলিতেও তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি। ছড়ার পাশাপাশি জীবনমুখি এবং নান্দনিক কবিতা সৃজনেও তিনি কুশলী দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। শিক্ষাদানের মহান ব্রতে নিয়োজিত এই সৃজনশীল কবি একাগ্র নিবেদনে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, শুদ্ধাচার, শুভব্রত এবং সামাজিক সুষম সুবিন্যাসে নিয়মিত একাগ্রতায় কাজ করে চলেছেন।

বক্তব্য প্রকাশে কবিতা এবং ছড়াকেই কবি শাহনাজ পারভীন প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ছড়ায় জীবনের অমিয় সত্যোচ্চারণ, প্রতিবাদ, দ্রোহ এবং জনজীবনের প্রত্যাশা-স্বপ্ন-মানবীয় সুস্বর উপস্থাপনের পাশাপাশি তিনি জীবন চাহিদা, বাস্তবতার সাথে অসঙ্গতির দ্বৈরথ, সু এবং কু এর নিয়ত দ্বন্দ্বমানতা অপার সুমিত বোধে উপস্থাপন করেছেন। জীবনের সাথে, জন-আকাঙ্খার সাথে অঙ্গাঙ্গী মিশে যান তিনি। আর তাই তার ছড়াগুলি তীর্যকতার পাশাপাশি সহৃদয় অন্তর-বিভাসে সুরভিত হয়ে ওঠে। সুচৈতন্যের প্রভালোকে গীতল জীবনের আহ্বান এবং বৈরিতার অপনোদনে এক সুহাস সুন্দরের আবাহণী তাঁর ছড়াগ্রন্থের বাণীতে উচ্চকিত হয়ে ওঠে।

“মাটির টানে” ছড়াগ্রন্থে কবি শাহানাজ পারভীন নিজ স্বদেশের মাটির অন্তরাত্মার স্পন্দনে সুরভিত হয়ে ওঠেন। চৈতন্যের সামগ্রিকতা জুড়ে শুদ্ধবোধ ক্রীড়াময় থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সফল অভিযাত্রায় বিজয়ের চেতনা তাঁকে উদ্বেলিত করে। ভাষা চেতনা তাঁকে প্রবলভাবে আত্মসচেতন করে তোলে। জনতা জীবনের সখ্যে সমর্পণ করেন নিজেকে। প্রকৃতির সুরম্যতায় আনন্দাপ্লুত হয়ে ওঠেন। ক্ষুদ্রতর, তুচ্ছতর সকল কিছুর মাঝ থেকেই জীবন সুন্দরের আশীর্বাণী অন্বেষণ করেন। পরিপার্শ্বের অমল সুশোভনতা তাঁকে আপ্লুত করে। রং রূপ বিভার অপরূপ উদ্ভাসের যাপিত জীবন এবং তার সকল সম্পদ এবং সীমাবদ্ধতার সাথে নিজেকে আত্মীকৃত করেন। আর তাই এই দেশ, এই সমাজ, এই মানুষেরা তাঁর আত্মার আপন হয়ে ওঠে। তিনি মাটির মানুষ হয়ে সম্পন্ন বিভায় উন্নত মস্তক হয়ে ওঠেন। প্রগাঢ় চেতনালোকে তিনি নিজেই হয়ে ওঠেন মাটি-শুদ্ধ অমলিন শুভ্র বাংলাদেশ।

নিজ আত্মজ ও আত্মজাকে উৎসর্গীকৃত এই শিশু কিশোর ছড়া কাব্যগ্রন্থ একটি সুখপাঠ্য ও মানস জাগৃতিমূলক সৃজন। ছড়া-কাব্যগ্রন্থটির প্রথম নির্মিতি “মাটির টানে” অনুসারেই গ্রন্থের নামকরণ। এখানে কবি বলেন-
“সোনার দেশের সোনার মাটি
কিনছি সবাই বেশি দামে,
বুক পাঁজরে যত্ন করে
আগলে রাখি রক্তঘামে।

“শক্তি সাহস ভালোবাসায়
এমন দেশ নেইতো আর,
এই দেশেতে জন্ম নিয়ে
মরতে পারি হাজারবার।“
দেশ মাতৃকার প্রতি এই অঙ্গীকার ও প্রত্যয়ের চৈতন্যালোকই গ্রন্থটির আদ্যন্ত সুরময়তায় পরিব্যাপ্ত।

“ফাগুন মাস” কবিতাটা অপরূপ ফাগুন বন্দনার পাশাপাশি মাতৃভাষা আন্দোলনে আর এক ফাগুন দিনে দেশপ্রেমী, ভাষা প্রেমী তারুণ্যের স্মৃতি-স্মরণে সুস্বর।
“ফাগুন মাসে শিমুল পলাশ
রঙিন করে বন,
ভাই হারানো দুখের ডালি
দহন করে মন।
“রক্তে ভেজা বর্ণমালা
শহীদ ভাইয়ের দান
ফাগুন আমার মায়ের ভাষা
গর্বে ভরে প্রাণ।“

“এসো শিখি” কবিতাটি প্রকৃতির সকল অনুষঙ্গই প্রতিনিয়তই আমাদেরকে যে প্রেষণা ও প্রেরণা দিয়ে চলেছে তারই নান্দনিক সুন্দর প্রতিভাস।
“সূর্য বলে আঁধার ঢেকে
আলোর পথে চলো,
চাঁদ বলে, সুখে দুখে,
মনের কথা বলো।
“আকাশ বাতাস নদী বলে
জীবন ছবি আঁকো,
আগুন বলে, পাপ পুড়িয়ে
সবার সাথে থাকো।“

আমাদের হৃদয়ের রং এবং ভাষা চেতনার অগ্নিশপথের বাঙ্ময়তার সুপ্রকাশের মাসে লা আবিরে ছেয়ে যাওয়া দিগঞ্চলের অনবদ্য পরিবেশনা “কৃষ্ণচূড়া”।
“ যে দেখ্য নগ্ন পায়ে
আসছে মিছিল সারি সারি
হৃদয় হরিৎ উপত্যকায়
ঢেউ খেলছে ফেব্রুয়ারি।“

“ নজরুল” শিরোনামের লেখাটি জাতীয় কবি এবং জনচেতনার প্রতীক কবি নজরুল স্মরণে সম্পন্ন সুরভিত নির্মিতি।
“ভাঙ্গলো শিকল লৌহ কপাট
আসলো নিয়ে ঝড় তুফান,
অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি
সর্বহারা, ভাঙ্গার গান।
———- কৃষক, শ্রমিক, কুলি-মজুর
ধনিক শ্রেণীর উঠলো রব,
সবার উপরে মানুষ সত্য
ঘুচিয়ে দিলো বজ্জাতি সব।“

“নতুন দেশ” এ প্রতীকি রূপ ব্যাঞ্জণায় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-সন্তোষ-নিরাপত্তা শোভিত প্রার্থিত আবাস-স্বপ্নের আলোকিত উদ্ভাস।
“নতুন দেশে যাব আমি
ফুল পরীদের সাথে,
নির্ভাবনায় ঘুমায় যারা
সুখে নিশুত রাতে।
নেইকো যেথায় অনাহারী
দুঃখ ভরা মুখ,
সবার দুঃখে কাতরতায়
বিলাই নিজের সুখ।“

“বাংলার রূপ” এ আমাদের শ্যামল শোভনতার মায়াময় রূপময় অনিন্দ্য স্বদেশকে আত্মার অঙ্গীকারে আবদ্ধ রাখার শুদ্ধ প্রত্যয়।
“সকল দেশের সেরা এ দেশ
বুক পাঁজরে রাখি ধরে,
সোনার মাটি অঙ্গে মেখে
মরতে পারি গর্ব করে।“

“যুদ্ধে যাব” এক অদম্য জীবনবাদীর দেশপ্রেমের চেতনায় শুদ্ধীকৃত চৈতন্যের সকল অপ-অনাচার অপনোদনে অভয় সন্মুখযাত্রার অনড় সুচেতনা।
“তোমার চোখে দেখবো মাগো
প্রথম সূর্যোদইয়,
অনিমিখের দু’চোখেতে
রাখবো না আর ভয়।
————–তোমার চোখের অগ্নিশিখায়
পুড়বে পশুর দল,
লক্ষ মানুষ তোমায় দেখে
ফেলবে খুশির জল——————।“

“মার্চ” ছড়া-কবিতাটিতে কবি আমাদের আনন্দাশ্রু আর রক্তবণ্যায় স্মিত জীবন বাস্তবতার মাসকে চিত্রিত করেছেন প্রকৃত আনন্দ-বিধূরতার পরিম্লান জোছনাভাসে।
“মার্চ আমার কান্না হাসির মাস
শোকের মিছিল ছড়ায় দীর্ঘশ্বাস,
ভাই হারিয়ে কাঁদে শোকে বোন,
মার্চ আমার মায়ের পোড়া মন।——————-
————মার্চ আমার শিকল ভাঙ্গার গান
সকল দেশের গর্বে ভরা মান,
মায়ের আঁচল লাল সবুজে আঁকা
মার্চ আমার বিজন ব্যথা ঢাকা।

“জাগো তরুণ” আলোকিত তারুণ্যের নবপ্রভা মহা উত্থানের আহ্বানে মুখর সঞ্জীবণী।
“———-কী হবে আর এমনি বেঁচে
বাড়িয়ে দেহের আয়ুষ্কাল,
তোমরা তরুণ দুঃসাহসী
আঁকবে চোখে স্বপ্নজাল।—————
তোমরা তরুণ আলোর প্রভা
রাখবে মনে মায়ের ঋণ,
মাড়িয়ে দিয়ে আঁধারটাকে
আনবে কেড়ে শুভ দিন।“থাকি”

“ হাসি খুশি পরিপাটি” ছড়া-কাব্যটি স্বাস্থ্য বিধি অনুসরণে সুস্থ সবল প্রাণোন্নত থাকার প্রত্যয়। লক্ষণীয় যে, এই ছড়াটি সহ অনেক ছড়াতেই কবিতা-স্নিগ্ধতার পাশাপাশি জ্ঞান উন্মীলন ও চেতনা জাগানিয়া বক্তব্যকে আন্তরিক প্রয়াসে সংবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
থাকবো সবাই সারাক্ষণ,
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে
সুস্থ রাখি দেহ মন।——————–
—-নিয়ম মাফিক ঘুম বিশ্রামে
শরীরটাকে সতেজ রাখি
শরীরচর্চা খাদ্যাভাসে
আসুন সবাই সুস্থ থাকি।“

“ভিটামিন” শীর্ষক ছড়া-কাব্যটিও স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নীরোগ থাকা এবং সবলতার প্রয়োজনে যথাযথ খাদ্য নির্বাচনের বিজ্ঞানসম্মত তথ্য উপস্থাপন। তবে সুচারু উপস্থানার কারণে তা আকর্ষণীয় সুনিশ্চিত।
“টাটকা সবুজ শাকসবজি
গাঁজর, আম খেলে সাথে,
দেহের বৃদ্ধি, দৃষ্টিশক্তি
রোগ প্রতিরোধ বাড়ে তাতে।————————–
——হাঁড়, দাঁত গঠন করে
ক্যালসিয়াম আর ফসফরাস,
হজম শক্তি বৃদ্ধি করে
যে খাবারে আছে আঁশ———————।“

“মানুষ হতে চাই” দেশপ্রেমের চেতনায় অমৃত শুভচেতনার উদ্বোধন।
“মানুষ হতে চাই যে মাগো
ক্ষুদিরামের মতো,
করবো ঘায়েল এদেশ থেকে
জালিম আছে যতো।————–
——আসবে ফিরে আবার দেশে
সুকান্ত, নজরুল
উপড়ে দেবো যেথায় আছে
দেশদ্রোহীর মূল————————-।“

“একটি ভাষণ একটি স্বাধীনতা” বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’এর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ’এর ভাষণ, এর প্রেক্ষিত এবং ভাষণোত্তর আন্দোলিত স্বদেশের অপরূপ চিত্রায়ন।
“৭ই মার্চের মুক্তিডাকে
লাখো মানুষ আসলো ছুটে
মাঠ কাঁপানো সেই ভাষণে
রক্তে আগুন উঠলো ফুটে।
একটি কথায় বাঁধলো তারা
শক্তি, সাহস, বুকে বল,
ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ো
মুক্তিকামী বীরের দল————————।“

“মা দিবস”ছড়া-কাব্যটিতে মাতৃপ্রীতি ও কর্তব্যবোধকে কেবলমাত্র একটি দিবস-কেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না রাখার প্রত্যয়।
“যুগ, বছর, মাস, তারিখ
সবই আমার মায়ের দিন,
গায়ের চামড়ায় বানালে জুতা
শোধ হবে না মায়ের ঋণ———————-।“

“বৃক্ষ” অসামান্য সুচেতনায় মানব অস্তিত্বের স্বার্থেই বৃক্ষের অপরিহার্যতার উপস্থাপন।
“বৃক্ষ সবার শ্রেষ্ঠ বন্ধু
নিরবে সে করে দান,
অক্সিজেনের যোগান দিয়ে
বাঁচিয়ে রাখে সবার প্রাণ।———————–
———বেশি বেশি গাছ লাগিয়ে
পরিবেশকে রক্ষা করি,
সবুজ শ্যামল ধরার মাঝে
রোগমুক্ত জীবন গড়ি।“
হৃদ উদ্ভাসের অনন্যতায় আলোকিত ছড়া-কাব্য “বিজয় আমার”। আমাদের মনন সুবিকাশে বিজয়ের চেতনা প্রোথনের শুদ্ধাচারী প্রকাশ।
“——-বিজয় আমার ঐক্য জোড়া হাত
আঁধার-আলোর গল্প বলার রাত
কপাল জুড়ে মায়ের আঁকা চুমি
বিজয় আমার স্বাধীন মাতৃভূমি।“

“ পথ শিশু” ছড়্রা-কাব্যটি সুবিধা বঞ্চিত পথশিষুদের দুরাবস্থা, দৈন্য, অবহেলা এবং সামাজিক অসঙ্গতির ব্যাদিচারী বাস্তবতার প্রতি তীব্র কষাঘাত।
“ঐ যে দেখো পথের ধূলোয়
নগ্ন দেহে কাঁদছে শিশু,
দাঁড়িয়ে আছে হাতটি পেতে
চাওনা ফিরে একটু পিছু।“—————–।“

পরিবেশ দূষণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং পারিবেশিক ভারসাম্য বিষয়ে ক্ষমাহীন ঔদাসীন্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় “খোকার ভাবনা”ছড়া-কবিতায়।
“মাগো, এখন পাইনা কেন
খালে বিলে মাছ
উজাড় হয়ে যাচ্ছে কোথায়
সারি সারি গাছ!——————————।“

“অক্ষর “ মাতৃভাষার বর্ণমালা-মমতার সুস্বর উচ্চারণ
“ অ আ ক খ
পড়ছি অবিরাম
মন ভরে যায় ডাকো যদি
এই অক্ষরে নাম।———————।“

“জন্মভূমি” নিজ মাতৃভূমির প্রতি অন্তঃস্থ অনুভব ও শ্রেয়তর বোধের সঞ্জীবণী।
“বাংলা আমার জন্মভূমি
সুখের অনুক্ষণ
তোর জঠরে জন্ম নিয়ে
ধন্য আমার মন।—————————।“

“মাটির টানে” কিশোর ছড়া কাব্য গ্রন্থে কবি শাহানাজ পারভীন শিউলী শিশু কিশোরদের উপযোগী করে সরল সুবোধ্য আকর্ষণীয় ভাষায় বিবিধ বিষয় তুলে ধরেছেন। ছড়া আঙ্গিকের এই কবিতাগুলি শিশু কিশোরদের মাঝে সুচেতনা, দেশপ্রেম, মানবিকতা, প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তুলতে নিশ্চিতই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শুদ্ধ সুজীবনের প্রতি তাদের অঙ্গীকার ও আকাঙ্খা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হবে। জীবন শোভনতা, সম্প্রীতি, হার্দ্যিকতা আর পরষ্পরের সাথে আন্তরিক সহাবস্থানের মনোভাব জাগ্রত হবে। মাতৃভাষার প্রতি আকর্ষণ প্রবল হবে। দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হবে। মানুষ ছাড়াও সর্বজীবের প্রতি ভালোবাসা ও সহযোগিতার মনোভাবে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

কবি শাহানাজ পারভীন শিউলী’এর পূর্ববর্তী শিশু কিশোর ছড়া-কাব্যগ্রন্থ “ডাংগুলি” যেমন বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় বিবিধ বিষয়ের অবতারণায় মানস বিকাশে অবদান রেখেছে, বর্তমান গ্রন্থটিও একই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। শিশু অবস্থা থেকে জীবন পর্যায়ে উত্তরণের বিবিধ ধাপে মানস বিকাশ ও সমৃদ্ধি, সুচেতনা এবং শুদ্ধ জীবনবোধের বিকাশের মাধ্যমেই মানুষ পরিপূর্ণ দেশব্রতী, হিতবাদী, আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠে। নিষ্ঠায় এবং একাগ্রতায় শাহানাজ পারভীন শিউলী জাগৃতির এই মহিমাময় কাজটিই নিরলস করে চলেছেন। কর্মসূত্রে শিক্ষাদানের মহতী পেশার সাথে মনন ও মানসের আলোক প্রদীপ্তি তাঁকে আলোকিত মানুষ গড়ার প্রয়াসে উজ্জীবিত রেখেছে। আর অন্তর্গত সেই সুমিত বোধের সমুজ্জ্বল প্রেরণাতেই তিনি নিরলস দেশ, মাটি, প্রকৃতি, ঋতু পরিক্রমা, নদী, বন, সমাজ ও জীবনানুষঙ্গের সকল কিছুকেই সুবোধ্য স্নিগ্ধতায় উপস্থাপন করে চলেছেন।

কবি শাহানাজ পারভীন শিউলী’র শিশু কিশোর ছড়া-কাব্যগ্রন্থ “মাটির টানে” ঋতু বৈচিত্র্যস্মিত বাংলাদেশের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেবে। প্রকৃতির সকল উপাদান, বৃক্ষা-লতা-পাতা-পাখি-পশুদের সমন্বয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবী গড়ার প্রণোদনা দেবে। দেশকে ভালোবেসে মহত্তর সৃজণালোকে উজীবিত করবে। নৈতিক সুবিকাশে আস্থাশীল করে তুলবে। শিশু কিশোর কেবল নয়, সুচেতনার সকল মানুষের কাছেই এটি উপভোগ্য ও আদৃত হবে। ।

কবি’র প্রথম প্রকাশনা “ডাংগুলি” এর প্রকাশকই এই গ্রন্থটির প্রকাশক। একই রকম অমনোযোগেরই পুণরাবৃত্তি ঘটেছে এই প্রকাশনাটিতেও । প্রুফ সংশোধনে শৈথিল্য পীড়াদায়ক। ছড়া-কবিতাগুলির সাথে সংযুক্ত ছবিগুলি আরও একটু আকর্ষণীয় ও বিষয়ানুগ করা যেত। কাগজের মান উন্নততর হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিলো। তবু সামগ্রিকভাবে কিছু সীমাবদ্ধতা সত্বেও এটি একটি শুভ কর্ম্যোদ্যোগ। সঙ্গতভাবেই তাই আমি কাব্যগ্রন্থটির ব্যাপক সাফল্য এবং বহুল পাঠ কামনা করি।

————————-
লেখক পরিচিতিঃ
ড. সাঈফ ফাতেউর রহমান।
শিক্ষাবিদ, কবি ও গবেষক,
(২০টি একাডেমিক গ্রন্থ প্রণেতা, প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৩২টি, কাব্যগ্রন্থ আলোচনা গ্রন্থ ০৩টি। প্রকৃতি বিষয়ক গ্রন্থ ০৪টি)।
লাল মাটিয়া, ঢাকা
ইমেইলঃ [email protected]
ইমেইলঃ ০১৭১৫৩৭৩৭০১