শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:১৯ অপরাহ্ন

উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তির আভাস

পাকিস্তানে করাচির তুলনায় লাহোর অনেক শান্ত, স্বাস্থ্যকর, সাজানো-গোছানো। সংস্কৃতিতেও উদার। কিন্তু কসমোপলিটন করাচির অহংকার অনেক। সেদিকে ইঙ্গিত করেই ব্রিটেনে বসবাসকারী করাচিতে জন্ম নেওয়া ঔপন্যাসিক কামিলা শামসি লিখেছিলেন, ‘যতক্ষণ করাচির লোক ভালো করে তোমার নাম না নেবে, ততক্ষণ তুমি পাকিস্তানে তারকা নও।’ সেই করাচি থেকে এবার পাকিস্তান নতুন প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভিকে পেল।

ভারত ও বাংলাদেশের মতোই পাকিস্তানে ক্ষমতাকেন্দ্রের মূল আকর্ষণ প্রধানমন্ত্রী; প্রেসিডেন্ট নন। কিন্তু আলভির নির্বাচন মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে অনেকের। ব্যতিক্রমী এক ব্যক্তি তিনি। দেশটির বিগত বেসামরিক প্রেসিডেন্টদের মতো নয় আলভির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। জেনারেল আইয়ুব খানবিরোধী ৬৯-এর গণ-আন্দোলনের সময় লাহোরে ২০ বছর বয়সী একজন ছাত্রযোদ্ধা ছিলেন আলভি। রাজনীতির প্রথাগত মূলধারায় হারিয়ে যাননি কখনো। দশকের পর দশক রাজনীতিতে তৃতীয় স্রোত সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন। পেশায় একজন দন্ত চিকিৎসক হলেও তাঁর ভাবমূর্তি মূলত একজন রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টের।

আলভিকে আমূল সংস্কারবাদী বলা যায় না। তবে তিনি একজন রূপান্তরবাদী। তাঁকে তাই অন্য প্রেসিডেন্টদের মতো দেখার সুযোগ নেই। নিয়মতান্ত্রিক পথে সুশাসন কায়েম করতেই ইমরানের সঙ্গে পিটিআইয়ের গোড়াপত্তন করেছিলেন ১৯৯৬ সালে। পিটিআইয়ের সংবিধান তাঁরই লেখা। অন্তত সাত বছর আলভি এই দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

আলভি বলছেন, তিনি একজন ‘সক্রিয় প্রেসিডেন্ট’ হতে ইচ্ছুক। কোনো ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীই ‘সক্রিয় প্রেসিডেন্ট’ পছন্দ করেন না। ইমরান তার ব্যতিক্রম হবেন, তেমন আশা করার কারণ নেই। তবে আলভিকে নিয়ে আপাতত হয়তো ইমরান খানের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। প্রায় ২২ বছরের ঘনিষ্ঠতা তাঁদের।

আলভি কি দক্ষিণ এশিয়াকে কোনো নতুন বার্তা দিচ্ছেন?
প্রেসিডেন্ট হিসেবে আরিফ আলভির নিয়োগ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অবশ্যই একটি গুরুত্ববহ ঘটনা। তিনি দেখিয়েছেন, একজন অ্যাক্টিভিস্টকে কোনো পরিস্থিতিতেই হাল ছেড়ে দিলে চলে না। তিনি এ-ও দেখালেন, অ্যাক্টিভিজম মূলধারার রাজনীতির মোড় ঘোরাতে পারে।

১৯৯৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর সব নির্বাচনে হেরেছেন এই চিকিৎসক-কাম-রাজনীতিবিদ। কিন্তু পরিবর্তনের স্বপ্ন ছাড়েননি কখনোই। করাচিতে বহুবার তাঁকে কলসি মাথায় নিয়ে পানিসংকটে মিছিল করতে দেখা গেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে এসে ওই শহরে বসতি গড়েছিল আলভিদের পরিবার।

অ্যাক্টিভিস্ট জীবনের কয়েক দশক পর, ২০১৩ সালে প্রথম আলভি কোনো নির্বাচনে জেতেন। এরূপ হার না-মানা মনোভাবই কার্যত পাকিস্তানে একজন ক্রিকেট তারকাকে প্রধানমন্ত্রী এবং একজন দন্ত চিকিৎসককে প্রেসিডেন্ট পদে বসিয়েছে। এঁরা সফল না ব্যর্থ হবেন, তার চেয়েও সমাজবিশেষজ্ঞদের জন্য বড় বার্তা হলো দক্ষিণ এশিয়া পুরোনো পরিবারবাদী রাজনীতির পথে আর হাঁটতে চাইছে না। সমাজ এবার ‘রূপান্তরবাদী’দের সুযোগ দিতে আগ্রহী।

ভারতে এই মুহূর্তে এই ঢেউ সবচেয়ে প্রবল। অ্যাক্টিভিস্ট অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও তাঁর বন্ধুদের আম আদমি পার্টি দিল্লিতে রাজ্য সরকার চালাচ্ছে। ২০১২ সালে দল গঠন করে ২০১৫ সালে দিল্লিতে সরকার গড়তে সমর্থ হলেও আম আদমি পার্টির উদ্যোক্তা কেজরিওয়াল-প্রশান্ত ভূষণ-যোগেন্দ্র যাদব নানাভাবে সমাজে সুশাসনের জন্য লড়ছিলেন অন্তত ১০ বছর আগে থেকে। অভিযোগ ছিল, এঁরা ‘রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ’। কিন্তু ‘দিল্লি নিরীক্ষা’র পরাজয় ঘটেনি এখনো।

একই ধারাবাহিকতায় সেখানে এখন আহমেদাবাদের দলিত তরুণ জিগনেষ মেভানি, বিহারের কানহাইয়া কুমার, দিল্লির উমর খালিদের আবির্ভাব হয়েছে। কেউ ৪০ না পেরিয়েই জাতীয় রাজনীতির প্রভাবশালী চরিত্র হয়ে উঠেছেন। কেবল টুইটার-ফেসবুকের জগৎ নয়, মোদি-অমিত শাহ-রাহুলকে এঁদের কথা শুনতে হচ্ছে এখন, প্রয়োজনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে হচ্ছে। কোনো দলের না হয়েও সমগ্র ভারতের পরিবর্তনবাদী তরুণ-তরুণীদের কণ্ঠস্বর এখন এঁরা।

জিগনেষ-কানহাইয়া-উমর প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বক্তৃতা দিচ্ছেন, মিছিল করছেন বা অনশনে শামিল হচ্ছেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এঁদের অ্যাক্টিভিজম ব্যাপক প্রভাব রাখবে বলে মনে করা হয়। ৩৬ বছর বয়সী মেভানি মোদির গুজরাটে স্বতন্ত্র হিসেবে ইতিমধ্যে এমএলএ হয়ে গেছেন; কানহাইয়াও বিহার থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে গায়ক কবীর সুমন অনেকটা এ রকম পথেই ২০০৬ সালে নন্দীগ্রামের জমির আন্দোলনের যুক্ত হয়ে ২০০৯ সালে যাদবপুর থেকে লোকসভায় এমপি হন। পরে আবার দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লালগড়ে ট্রাইবালদের আন্দোলনে সমর্থন দেন। বোঝা যাচ্ছে, সুমন তাঁর অ্যাক্টিভিজমকে রাজনীতির মাঝে বিলীন করতে অনিচ্ছুক।

পাকিস্তানের আরিফ আলভি বা ভারতের কানহাইয়া-উমর-মেভানিদের মতো রূপান্তরবাদী অ্যাক্টিভিস্ট বাংলাদেশেও বিগত দশকগুলোয় অনেক জন্মেছেন। প্রথাগত রাজনীতির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ছিটকে পড়েছেন তাঁরা। কিন্তু চরম কর্তৃত্ববাদী পরিস্থিতিতেও অনেকেও এখন লড়ছেন। বিগত দশকের অন্যতম আলোচিত তেল-গ্যাস-বন্দর রক্ষা কমিটির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও প্রকৌশলী শহীদুল্লাহর মতো অদলীয় ব্যক্তিরা। যদিও তাতে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু অদলীয় অ্যাক্টিভিস্টরাই ছিলেন ওই আন্দোলনের ভরকেন্দ্র। সেই আন্দোলন অনেকটা ঝিমিয়ে পড়লেও কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন আবার অদলীয় অ্যাক্টিভিজমের শক্তি দেখাল দেশকে। এই দুই আন্দোলন বাংলাদেশে প্রথাগত রাজনীতিবিদদের বহুদিনের লালিত ইসলাম বনাম সেক্যুলার বিভেদরেখাকে অকার্যকর করে দিয়েছে। ‘শাহবাগ বনাম শাপলা’র প্রতীকী সংঘাত যখন হারজিৎহীন ‘স্টেলমেইট’ অবস্থায় বুদ্ধিবৃত্তিক হানাহানিতে রণক্লান্ত, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তখন তথাকথিত ওই লক্ষ্মণরেখা এড়িয়ে বলতে চাইছে, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। দক্ষিণ এশিয়ায় এই প্রথম কোনো অ্যাক্টিভিজম এত কম সময়ে ‘সমাজ’-এর মূল চাওয়া হিসেবে ন্যায়বিচারের ধারণাকে সামনে হাজির করার অভূতপূর্ব পরিপক্বতা দেখাল। স্বভাবত তাদের এই রাষ্ট্রনৈতিক আওয়াজ দ্রুত ‘সমাজ’-এর হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সমাজ এর ‘মালিকানা’ নেয়।

সংগত কারণেই আপাতত এসব আন্দোলন ও অ্যাক্টিভিজম প্রশ্নে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের মনোভাব ইতিবাচক নয়। প্রথাগত রাজনীতিও তার নির্যাস আমলে নিতে অনিচ্ছুক।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে নবীন এই অ্যাকটিভিস্টরা কী করবেন এখন? তাঁরা কি পূর্বসূরিদের মতো হাল ছেড়ে দেবেন? নাকি আলভি, কেজরিওয়াল, সুমনদের মতো লেগে–পড়ে থাকবেন? সম্ভবত এরূপ অ্যাক্টিভিস্টদের ভবিষ্যৎ রণনীতি-রণকৌশলের ওপরই হয়তো নির্ভর করছে বাংলাদেশের রাজনীতির হবু দিনগুলো।

আসছে কি নতুন সময়?
কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন কেবল বাংলাদেশেই নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অদলীয় ভবিষ্যৎ রাজনীতিরও বড় এক ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই উভয় আন্দোলনের কর্মীরা কমিউনিটির সঙ্গে মিলে রাষ্ট্রকে নিচ থেকে ‘মেরামত’ করতে সচেষ্ট হয়েছিল। যারা মনে করেছে, অহিংস সংস্কারবাদী পথে ন্যায়বিচার ও সুশাসনের জন্য অনেক কিছু করার আছে।

রাজনীতির এই পথ নিয়ে বিতর্ক থাকবে। কিন্তু এই প্রথম তরুণ-তরুণীরা ঔপনিবেশিক ধাঁচের অকেজো রাষ্ট্রকে প্রত্যাখ্যান করেই থেমে যেতে চাইছিল না। তারা একে নতুন করে নির্মাণেও হাত লাগাতে চাইছিল। যে মডেলকে বলা যায় ‘প্রতিবাদ-আন্দোলন-নির্মাণ’। সাংগঠনিক ‘কেন্দ্র’হীন অনানুষ্ঠানিক এই সমাবেশশক্তি প্রচলিত রাজনীতির সামনে অবশ্যই নতুন চমক। যে রাজনীতির সব প্রতিশ্রুতি এত দিন ‘প্রতিবাদ-আন্দোলন’ শেষে ‘পার্টি-স্বার্থে’র কাছে থেমে যেত।

সেদিক থেকে এটা নতুন সময়ও বটে। যে সময় বলছে, নিরাপদ সড়ক চাওয়া প্রজন্ম এবং কোটা সংস্কারের দাবিতে সংঘবদ্ধ তরুণ-তরুণীদের বাদ দিয়ে আগামী দিনে কোনো পরিবর্তনবাদী রাজনীতি দাঁড়াবে না। একই সঙ্গে পরিবর্তন চিন্তা ছাড়াও ভবিষ্যতে কোনো রাজনীতি চলবে না। অ্যাক্টিভিজম নীরবে উপমহাদেশের রাজনীতির বিষয়সূচি ও ছক পাল্টে দিচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী ও পরিবারবাদী রাজনীতির শেষ অধ্যায় হতে পারে এটা।

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar