বুধবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ০৬:২৬ পূর্বাহ্ন

আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থান?

ঈদুল আজহা উপলক্ষে বাণী দিচ্ছিলেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। গত ২১ আগস্ট তাঁর বাণী দেওয়ার সময়ই প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ লক্ষ্য করে দুটি রকেট ছোড়ে তালেবান।

টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারে রকেট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে। বিকট শব্দে প্রেসিডেন্টের বাণী বিঘ্নিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঈদের বাণীর মধ্যে ঢুকে যায় অন্য কথা। প্রেসিডেন্ট গনি বলতে বাধ্য হন, ‘তারা (হামলাকারীরা) যদি ভেবে থাকে, রকেট হামলা আফগানদের দমিয়ে দেবে, তবে ভুল ভেবেছে।’

প্রথম রকেটটি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছেই পড়ে। দ্বিতীয়টি ন্যাটোর একটি কম্পাউন্ড ও মার্কিন দূতাবাসের কাছে। হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। কিন্তু তাই বলে নিরুদ্বেগে থাকারও কারণ নেই। যেখানে রকেট পড়েছে, তা রাজধানী কাবুলের সবচেয়ে নিরাপদ ও সুরক্ষিত এলাকা বলে পরিচিত।

প্রেসিডেন্টের বাণী চলাকালে তাঁর প্রাসাদ লক্ষ্য করে রকেট হামলাকে তালেবানের শক্তি প্রদর্শনে এক ‘মহড়া’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। জঙ্গিগোষ্ঠীটির এই হামলার বার্তা হলো—তারা চাইলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদেও আঘাত হানতে পারে।

তালেবানের লক্ষ্য যে কাবুল, তা তারা গত মাসের মাঝামাঝি রণক্ষেত্রে বুঝিয়ে দিয়েছে। তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী গজনি দখল করে নেয়।

গজনি প্রদেশের সামরিক কৌশলগত শহরটি আফগানিস্তানের রাজধানীর কাছেই অবস্থিত। কাবুল থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার পথ গজনি। দূরত্ব ১০০ মাইলেরও কম।

বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। রয়টার্স ফাইল ছবিবর্তমানে আফগানিস্তানে প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। রয়টার্স ফাইল ছবি

তুমুল লড়াইয়ের পরে অবশ্য গজনি থেকে তালেবান যোদ্ধাদের হটিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই হামলা আফগান সরকারসহ পুরো দেশকেই আতঙ্কিত করে। আগামী অক্টোবরে আফগানিস্তানে পার্লামেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। গজনির হামলার পর এই নির্বাচন নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মাস কয়েক আগেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বেশ ভাব নিয়ে বলেছিলেন, আফগানিস্তানে তালেবান এখন বেকায়দায়। অথচ সেই তালেবানই কাবুলের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছে।

এক-দুই বছর নয়, টানা ১৭ বছর ধরে আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলছে। অত্যাধুনিক সামরিক শক্তিতে বলীয়ান যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্ররা কিংবা আফগান সরকার—কেউই তালেবানকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি; বরং এখন যা পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে—আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরুত্থান ঘটেছে।

লং ওয়ার জার্নাল বলছে, আফগানিস্তানের প্রায় ২০০টি জেলার দখল নিতে চেষ্টা করছে তালেবান। আর ৫০টি জেলা তালেবানের দখলে আছে।

আফগান সেনাবাহিনী এখনো স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। রয়টার্স ফাইল ছবিআফগান সেনাবাহিনী এখনো স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। রয়টার্স ফাইল ছবি

স্পেশাল ইন্সপেক্টর জেনারেল ফর আফগানিস্তান রিকনস্ট্রাকশনের (সিগার) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, আফগান জেলাগুলোর মধ্যে ১৫ শতাংশ (৫৯টি) নিয়ন্ত্রণ করছে তালেবান। ২৯ শতাংশের (১১৯টি) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই চলছে। আর আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে ৫৬ শতাংশ (২২৯টি) জেলা।

আফগান সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। তাদের দক্ষতা, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। সঙ্গে আছে নানামুখী অভ্যন্তরীণ সমস্যা। সব মিলিয়ে আফগান সেনাবাহিনী এখনো স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে তালেবানের হামলা ঠেকাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর জীবন তো যাচ্ছেই।

আফগানিস্তানে তালেবানের হামলায় অহরহ প্রাণ ঝরছে। রয়টার্স ফাইল ছবিআফগানিস্তানে তালেবানের হামলায় অহরহ প্রাণ ঝরছে। রয়টার্স ফাইল ছবি

বর্তমানে আফগানিস্তানে প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে তারাও খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। তারা এখন হার-জিতের কথা ভুলে ব্যয়বহুল এই যুদ্ধের ইতি টানতে মরিয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দীর্ঘ এই যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে খোদ পশ্চিমা কূটনীতিক ও সামরিক বিশ্লেষকেরা এখন হতাশার সুরে কথা বলছেন। তাঁদের ভাষ্য, ২০০১ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক হামলায় তালেবানের পতনের পর জঙ্গিগোষ্ঠীটি যেভাবে টিকে আছে, বিশেষ করে ইদানীং তারা যেভাবে মাথা তুলে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। তালেবানের এই পুনরুত্থান আফগান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের কার্যকারিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধের শেষ কীভাবে হবে, তা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar