বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ০৬:২৯ পূর্বাহ্ন

অনাদরে ছোট উদ্যোক্তারা

মাতৃভূমির খবর ডেস্ক: করোনায় রফতানিমুখী গার্মেন্ট খাতের শ্রমিকদের বেতনভাতার জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। কিন্তু জিডিপিতে ২৫ শতাংশ অবদান রাখা অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তি জোগানো এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প) খাতের শ্রমিকদের জন্য কোনও সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা আসেনি। এই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনার কারণে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এসএমই খাতের এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক কোটিরও বেশি উদ্যোক্তা বিপাকে পড়েছেন। একইসঙ্গে বেতনভাতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন এই ছোট ব্যবসায় নিয়োজিত অন্তত চার কোটি মানুষ।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এসএমই খাতের উদ্যোক্তা ও এই খাতের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা। কিন্তু এসএমই খাতের শ্রমিকদের বিষয়ে এখনও আমরা কিছু শুনছি না।’ তিনি বলেন, ‘দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাচ্ছে এসব ছোট ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। তাদের সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিশেষ করে দোকান, রেস্টুরেন্ট  বা এসএমই যেসব প্রতিষ্ঠান অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে বড় ভূমিকা রাখে, তাদের জন্য সরকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করতে পারে।’

তিনি উল্লেখ করেন, অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বন্ধ প্রায়। ফলে তাদের কর্মচারীদের বেতনভাতা পেতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

এসএমই খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, করোনাভাইরাসের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এই এপ্রিল মাসেই আপৎকালীন তহবিল থেকে এক থেকে দুই শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া  প্রয়োজনীয় খাদ্য, রেস্টুরেন্ট খাদ্য ও ওষুধ বিক্রিতে অন্তত আগামী তিন থেকে ছয়  মাস ভ্যাট স্থগিত রাখতে হবে। ছোট ব্যবসায়ীরা যাতে ইউটিলিটি বিল পরিশোধে তিন মাসের সময়ের পাশাপাশি ইউটিলিটি বিল এক বছর ধরে কিস্তিতে পরিশোধ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

করোনার এই পরিস্থিতিতে আগামী চার মাসের ভাড়ার ওপর ভ্যাটে মওকুফ চেয়েছেন উদ্যোক্তারা। এছাড়া, তারা ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য তিন থেকে ছয় মাসের সময় চেয়েছেন সরকারের কাছে।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘জিডিপিতে ক্ষুদ্র, পাইকারি, খুচরা, হোটেল রেস্টুরেন্ট ও পরিবহন খাত মিলে এসএমই খাতের অবদান প্রায় ২৫ শতাংশের মতো। অথচ এখন সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে। তিনি বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি এসএমই খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা একটি ফান্ড চাই, যা থেকে  শুধু শ্রমিকদের বেতন দেওয়া হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য আমরা আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছি সরকারের কাছে। তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাত দিয়ে বলেন, ‘১৫ জনের কম কর্মচারী থাকা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৩ লাখ ৭২ হাজার, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৩৯ ভাগ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৯২৯ জন কর্মী কাজ করেন।’

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছেন। পরিসংখ্যান মতে, দেশের মোট ৯০ শতাংশ শিল্প ইউনিট এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। সেই সঙ্গে শিল্প কারখানায় নিয়োজিত মোট শ্রমিকের ৮৭ শতাংশ এবং মোট সংযোজিত পণ্যের ৩৩ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অন্তর্ভুক্ত।

এ প্রসঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন এন্ট্রাপ্রেনার্স নেটওয়ার্ক ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (ওয়েন্ড) এর সভাপতি নাদিয়া বিনতে আমিন বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তারা পথে বসার উপক্রম হয়েছে। জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ। আর এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অবদান ৮০ শতাংশ। এই খাতের অধিকাংশই এখন বাড়ি ভাড়া দিতে পারছে না। অনেকেই বেতন দিতে পারছে না। যারা ঋণ নিয়েছে, তারা ঋণ শোধ দিতে পারছে না। বাধ্য হয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছে। অথচ ছোট ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদেরকে অবহেলা করা হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের অধীনে প্রায় এক কোটি মানুষ কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘সাধারণত পহেলা বৈশাখ ও ঈদুল ফিতরকে এসএমই পণ্য বিক্রির প্রধান মৌসুম বলে ধরা হয়। অথচ এখন সবার কাজই বন্ধ। এই অবস্থায় একটি আপৎকালীন ফান্ড গঠন করা জরুরি। সেখান থেকে নারীরা যাতে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘করোনার প্রেক্ষাপটে ছোট ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের জন্য সহায়তা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এই সেক্টরের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা অতি অল্প পুঁজিতে ব্যবসা করেন। তাদের টিকে থাকার সক্ষমতাও কম।’ এ কারণে তাদের জন্য দ্রুত একটা জরুরি ফান্ড গঠন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নিউজটি শেয়ার করুন





সর্বস্বত্ব © ২০১৯ মাতৃভূমির খবর কর্তৃক সংরক্ষিত

Design & Developed BY ThemesBazar